চিকিৎসা-নথি প্রকাশ নিয়ে ৩ চিকিৎসককে আইনি নোটিস মমতার আইনজীবীর, অনুমতি ছাড়াই রিপোর্ট গেল কী ভাবে?

নন্দীগ্রামে মমতার পুরনো চোটের চিকিৎসা-নথি প্রকাশ্যে আসার পর এসএসকেএম ও বাঙুরের তিন চিকিৎসককে আইনি নোটিস পাঠালেন তাঁর আইনজীবী অর্ক নাগ।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ২০২১ সালের পায়ের চোটের চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি প্রকাশ্যে আসা নিয়ে এ বার আইনি পথে গেলেন তাঁর আইনজীবী। এসএসকেএম হাসপাতাল এবং বাঙুর ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সেসের তিন চিকিৎসককে দু’পাতার আইনি চিঠি পাঠিয়ে রিপোর্ট প্রকাশের আগে মমতার অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে, কোনও আইনানুগ প্রক্রিয়া মেনে ওই নথি বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর হাতে পৌঁছেছিল কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন আইনজীবী অর্ক নাগ।

সোমবার সকালে এসএসকেএম-এর অধিকর্তা চিকিৎসক মণিময় বন্দ্যোপাধ্যায়, এমএসভিপি চিকিৎসক পীযূষকুমার রায় এবং বাঙুর ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সেসের নিউরোলজি বিভাগের প্রধান চিকিৎসক অতনু বিশ্বাসকে ওই নোটিস পাঠানো হয়েছে। মমতার আইনজীবীর বক্তব্য, যে চিকিৎসা-নথি প্রকাশ্যে এসেছে, তার ভিত্তিতে অসম্পূর্ণ এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিবরণ প্রকাশ করা হয়েছে।

বিতর্কের সূত্রপাত গত কয়েক দিনে। নন্দীগ্রামে মমতার পায়ে চোট লাগার ঘটনা নিয়ে ফের প্রশ্ন তোলেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শুক্রবার নন্দীগ্রামে ভোটের প্রচারে গিয়ে তিনি দাবি করেছিলেন, তাঁর কাছে মমতার চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি রয়েছে। পরের দিন নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করে সেই নথির অংশ বিশেষ প্রকাশ্যে আনেন তিনি। প্রকাশিত একটি নথিতে লেখা ছিল, ‘ফ্র্যাকচারের কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি’।

এর পরেই মমতার পায়ের চোট নিয়ে পুরনো রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন করে সামনে আসে। ২০২১ সালের ১০ মার্চ নন্দীগ্রামে বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে গিয়ে আহত হয়েছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। তাঁকে কলকাতায় এনে এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে এমআরআই করানোর জন্য তাঁকে বাঙুর ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সেসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই সময় এসএসকেএম-এর তরফে প্রকাশিত মেডিক্যাল বুলেটিনে বাঁ পায়ের গোড়ালির হাড়ে গুরুতর আঘাতের কথা জানানো হয়েছিল।

অর্থাৎ, পাঁচ বছর আগের চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি এবং তৎকালীন মেডিক্যাল বুলেটিনের তথ্যকে সামনে রেখেই ফের রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। তবে এখন বিতর্কের কেন্দ্র শুধু মমতার চোট আদৌ কতটা গুরুতর ছিল, তা নয়। তার সঙ্গে জুড়েছে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—একজন রোগীর ব্যক্তিগত চিকিৎসা-নথি কী ভাবে প্রকাশ্যে এল এবং সেই নথি প্রকাশ করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনগত অধিকার বা অনুমতি ছিল কি না।

মমতার আইনজীবী নোটিসে স্পষ্ট করেছেন, কারও ‘জানার অধিকার’ থাকলেই অন্য ব্যক্তির গোপনীয় চিকিৎসা-নথি প্রকাশ বা জনসমক্ষে প্রচারের অবাধ অধিকার তৈরি হয় না। চিকিৎসকদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে, মমতার চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনও নথি বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর কাছে দেওয়া হয়েছিল কি না। যদি দেওয়া হয়ে থাকে, তবে তার আগে যথাযথ আইনানুগ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নও তোলা হয়েছে।

আইনজীবীর বক্তব্য, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই যদি ওই নথি প্রকাশ করা হয়ে থাকে, তা হলে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা উচিত। ভবিষ্যতে মমতার চিকিৎসা সংক্রান্ত গোপনীয়তা যাতে আর লঙ্ঘিত না হয় এবং তাঁর সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য যাতে ছড়ানো না হয়, তা নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়েছে নোটিসে।

এই বিতর্কে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও এসেছে। কালীঘাটপন্থী তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ প্রশ্ন তুলেছিলেন, কী ভাবে মমতার ব্যক্তিগত চিকিৎসা-নথি প্রকাশ্যে এল। সমাজমাধ্যমে তিনি চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চিকিৎসা-তথ্য প্রকাশের নিয়ম নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। সেই মন্তব্যের দু’দিনের মধ্যেই মমতার আইনজীবীর তরফে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের আইনি নোটিস পাঠানো হল।

তবে নোটিস পাঠানোর অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোনও অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। আপাতত মমতার আইনজীবী তাঁদের কাছে নথি প্রকাশের ভিত্তি, অনুমতি এবং আইনানুগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে ব্যাখ্যা চেয়েছেন। সেই জবাবের পরেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।

ফলে নন্দীগ্রামের সেই পুরনো ‘পা-ভাঙা’ বিতর্ক ফের নতুন মোড় নিয়েছে। রাজনৈতিক তরজার পাশাপাশি এ বার সামনে এসেছে রোগীর চিকিৎসা-গোপনীয়তা এবং ব্যক্তিগত মেডিক্যাল রেকর্ড প্রকাশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন। মমতার আইনজীবীর নোটিসের জেরে এসএসকেএম এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের জবাবের দিকেই এখন নজর থাকবে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন