প্রাক্তন তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনকে ঘিরে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের মধ্যেই এবার সামনে এল নজরুল মহোৎসবের খরচ নিয়ে নতুন বিতর্ক। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে কলকাতার শিশির মঞ্চে ২০২৫ এবং ২০২৬ সালে আয়োজিত একই অনুষ্ঠানের সরকারি ব্যয়ের হিসাব। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নজরুল মহোৎসবের জন্য খরচ দেখানো হয়েছিল ৩৭ লক্ষ ৯২ হাজার ৫৩ টাকা। অথচ ২০২৬ সালে একই মঞ্চে অনুষ্ঠান করতে সরকারি খরচ হয়েছে ১ লক্ষ ৪৪ হাজার ৪০০ টাকা। এই বিপুল ব্যবধান নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
সূত্রের খবর, এই ব্যয়ের পার্থক্য নিয়ে অভিযোগ ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে জমা পড়েছে। অভিযোগে শুধু ইন্দ্রনীল সেনের নাম নয়, তৎকালীন তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের কয়েকজন আধিকারিকের নামও রয়েছে। শিশির মঞ্চের আধিকারিক তপন তরফদারের নামও অভিযোগের তালিকায় রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
২০২৫ সালে যখন নজরুল মহোৎসব আয়োজন করা হয়েছিল, তখন রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের দায়িত্বে ছিলেন ইন্দ্রনীল সেন। সেই অনুষ্ঠানের সরকারি ব্যয় হিসেবে ৩৭,৯২,০৫৩ টাকা দেখানো হয়েছিল বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। পরের বছর রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর একই মঞ্চে ফের নজরুল মহোৎসব আয়োজন করা হয় তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের উদ্যোগে।
কিন্তু ২০২৬ সালের অনুষ্ঠানের জন্য সরকারি হিসাবে ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় মাত্র ১,৪৪,৪০০ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে একই ধরনের অনুষ্ঠানের খরচে ৩৬ লক্ষ ৪৭ হাজার ৬৫৩ টাকার ফারাক দেখা যাচ্ছে। এই হিসাবের কারণ কী, ২০২৫ সালের ব্যয়ের প্রতিটি খাতে কত টাকা খরচ হয়েছিল এবং সেই খরচ যথাযথ ছিল কি না—তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
তবে শুধু ব্যয়ের পার্থক্য থেকেই দুর্নীতি প্রমাণিত হয় না। অনুষ্ঠানের পরিসর, শিল্পী, মঞ্চসজ্জা, প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা, প্রচার বা অন্যান্য পরিষেবায় দুই বছরের মধ্যে কোনও পরিবর্তন হয়েছিল কি না, সেগুলিও যাচাই করা প্রয়োজন। বর্তমানে এই বিষয়টিই অভিযোগের তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে এর আগেও দুর্গাপুজোর ‘প্রিভিউ শো’-এর পাস সংক্রান্ত আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। ওই মামলায় এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED) তদন্ত করছে এবং সেপ্টেম্বরের শেষে তাঁর ঠিকানায় তল্লাশির পর তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়েছিল বলে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। ইন্দ্রনীল সেন অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এছাড়াও তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের দায়িত্বে থাকার সময় ‘বাংলা মোদের গর্ব’ প্রকল্পে টেন্ডার সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এবার নজরুল মহোৎসবের ব্যয় নিয়ে নতুন অভিযোগ সামনে আসায় তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তালিকা আরও বাড়ল।
নজরুল মহোৎসবের খরচ নিয়ে নতুন অভিযোগ সামনে আসার পর রাজনৈতিক আক্রমণও শুরু হয়েছে। রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য ইন্দ্রনীল সেনকে নিশানা করে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসকে আক্রমণ করেছেন। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গও টেনে মন্তব্য করেছেন তিনি।
পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষও ইন্দ্রনীল সেন এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ করে বক্তব্য রেখেছেন। তবে এগুলি রাজনৈতিক বক্তব্য এবং অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
নজরুল মহোৎসবের ক্ষেত্রে ২০২৫ ও ২০২৬ সালের সরকারি ব্যয়ের এই বিপুল পার্থক্যই এখন মূল প্রশ্ন। অভিযোগের ভিত্তিতে কোনও তদন্ত শুরু হলে দুই বছরের অনুষ্ঠানের খরচ, সংশ্লিষ্ট নথি, বরাত এবং অর্থপ্রদানের হিসাব খতিয়ে দেখার পরই বোঝা যাবে অনিয়ম হয়েছিল কি না। আপাতত বিষয়টি অভিযোগের পর্যায়েই রয়েছে।



