জাঙ্গিপাড়ার সিংটি কৃষি সমবায় সমিতি থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেওয়ার অভিযোগ ঘিরে প্রাক্তন মন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে তাঁর নিজের নামে ৮৫ লক্ষ টাকা এবং এক আত্মীয়ের নামে আরও ১০ লক্ষ টাকা ঋণ নেওয়ার বিষয়টি।
বিষয়টি সামনে আসে তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষের অভিযোগের পর। তাঁর বক্তব্য, কৃষি সমবায় সমিতি মূলত কৃষকদের ঋণ দেওয়ার জন্য। সেখানে কৃষক না হয়েও কী ভাবে স্নেহাশিস এত টাকা ঋণ পেলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। স্নেহাশিস যখন রাজ্যের মন্ত্রী ছিলেন, সেই সময়েই ওই ঋণ নেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
কুণাল আরও প্রশ্ন তুলেছেন, ঋণের টাকা পরবর্তীতে ফেরত দেওয়া হয়েছিল কি না। যদি টাকা ফেরত দেওয়া হয়ে থাকে, তা হলে সেই অর্থের উৎস কী ছিল, সেটিও তদন্তের আওতায় আসা উচিত বলে দাবি করেছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, প্রভাবশালী হওয়ার কারণেই স্নেহাশিস ওই ঋণ পাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। এগুলি কুণালের অভিযোগ; তদন্তের ফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত তা প্রমাণিত ঘটনা নয়।
এদিকে, সিংটি কৃষি সমবায় সমিতির আর্থিক লেনদেনে অনিয়মের অভিযোগে এর আগে সমবায়ের ম্যানেজার স্বপন পাত্র এবং কর্মী রমেশ পাত্রকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। এবার সেই একই সমবায় থেকে স্নেহাশিসের নামে ঋণ নেওয়ার অভিযোগও তদন্তের আওতায় এল।
অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসুর নেতৃত্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশনের সদস্যেরা সিংটি কৃষি সমবায় সমিতিতে গিয়ে নথি সংগ্রহ করবেন বলে জানা গিয়েছে। ঋণ মঞ্জুরির প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র এবং সমবায়ের নিয়ম মেনে ওই ঋণ দেওয়া হয়েছিল কি না—তদন্তে সেগুলিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এই তদন্তের প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ১৫ বছরে রাজ্যে তৃণমূল সরকারের আমলে ওঠা বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশন গঠনের কথা জানানো হয়েছিল। ২০১১ থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারি দফতরে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ, আমপান ত্রাণ, মিড-ডে মিল, স্বাস্থ্য, শিক্ষা-সহ একাধিক ক্ষেত্র এই পর্যালোচনার আওতায় রাখা হয়েছে।
তবে কমিশনের ভূমিকা সরাসরি তদন্তকারী সংস্থার মতো নয়। কোনও অভিযোগে দুর্নীতির প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেলে পুলিশকে এফআইআর করার নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে কমিশনের। আবার কোনও বিষয় নিয়ে ইডি, সিবিআই বা অন্য তদন্তকারী সংস্থা ইতিমধ্যেই তদন্ত করলে সেই মামলায় কমিশন হস্তক্ষেপ করবে না বলে জানানো হয়েছে।
ফলে সিংটি সমবায় ঋণ-কাণ্ডে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নথি যাচাই। স্নেহাশিস চক্রবর্তীর নামে ৮৫ লক্ষ টাকা এবং তাঁর আত্মীয়ের নামে ১০ লক্ষ টাকা ঋণ কী প্রক্রিয়ায় অনুমোদিত হয়েছিল, আবেদনকারীদের যোগ্যতা কী ছিল এবং সমবায়ের নিয়ম মেনেই সেই অর্থ দেওয়া হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তেই খোঁজা হবে।
এখনও পর্যন্ত স্নেহাশিস চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ভিত্তিতে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো তদন্ত-ফল প্রকাশ্যে আসেনি। তাই ঋণ নেওয়ার অভিযোগ এবং তদন্ত শুরুর বিষয়টি আলাদা করে দেখা জরুরি। কমিশনের নথি যাচাই ও পরবর্তী পদক্ষেপের পরেই এই ঘটনায় আইনি বা প্রশাসনিকভাবে আর কী পদক্ষেপ হয়, তা স্পষ্ট হবে।



