দিল্লিতে বিরোধী জোটের বৈঠকে যোগ দিতে গিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে নিয়ে ফের সরব হলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার পৃথক সাংবাদিক বৈঠকে মমতা এবং তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের ভোটপ্রক্রিয়া, SIR এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে একাধিক অভিযোগ তোলেন। মমতা সরাসরি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি করেছেন।
মমতার বক্তব্য, ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না, তার আগেই দেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন হতে পারে। তিনি বলেন, ‘‘খেলা শুরু হয়ে গিয়েছে’’ এবং ‘‘শিগগিরই সুখবর’’ আসবে। তবে তিনি কোনও নির্দিষ্ট ঘটনা বা সময়সীমা উল্লেখ করেননি।
জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর দাবিতে মমতা বলেন, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদ থেকে তাঁকে সরে যেতে হবে। তাঁর বক্তব্য, জ্ঞানেশ নিজে থেকে সরে গেলে তাঁর সম্মান থাকবে। না হলে পরবর্তী সময়ে তাঁকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে—এমন কথাও বলেন মমতা। এগুলি সম্পূর্ণত মমতার রাজনৈতিক বক্তব্য ও দাবি।
জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে মমতার অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে SIR এবং ভোটপ্রক্রিয়া। এর আগে সেপ্টেম্বরেও মমতা নির্বাচন কমিশন ও জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সরব হয়ে পুরনো ভোটার তালিকা ফিরিয়ে নতুন করে নির্বাচন করার দাবি জানিয়েছিলেন। সেই সময় তিনি কমিশনের বিরুদ্ধে ‘ভোটচুরি’ এবং EVM সংক্রান্ত অভিযোগও তুলেছিলেন।
বৃহস্পতিবারের সাংবাদিক বৈঠকে মমতা নির্বাচন কমিশনের ২০২৩ সালের আইনি রক্ষাকবচ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর দাবি, ওই আইন সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন নিয়ে পাস হয়নি। তিনি আরও অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশনের আইটি শাখার শীর্ষ পদাধিকারী সীমা খন্নার নিয়োগ এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় তাঁর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
অন্য দিকে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ও SIR-কে ঘিরে একটি পরিসংখ্যান সামনে আনেন। তাঁর দাবি, রাজ্যের অন্তত ১৫০টি বিধানসভা কেন্দ্রে SIR-এর কারণে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থীর জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি। তিনি কোন কেন্দ্রে কত নাম বাদ পড়েছে এবং সেখানে বিজেপি কত ভোটে জিতেছে—তার হিসাবও তুলে ধরেছেন বলে আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
অভিষেকের আরও অভিযোগ, জ্ঞানেশ কুমারের তত্ত্বাবধানে ফর্ম ৬-এর মাধ্যমে নতুন ভোটারের নাম ভোটার তালিকায় যোগ করা হয়েছে এবং তাঁদের একটি অংশ অন্য রাজ্য থেকে বাংলায় আনা হয়েছিল। এই অভিযোগের পক্ষে তিনি যে পরিসংখ্যান সাংবাদিক বৈঠকে তুলে ধরেছেন, তা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের পাল্টা বক্তব্য এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে অভিযোগগুলিকে অভিযোগ হিসাবেই দেখা প্রয়োজন।
ভোটের পর থেকেই তৃণমূলের পক্ষ থেকে নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। অভিষেক ফের ভোটকেন্দ্রের CCTV ফুটেজ প্রকাশের দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য, তিনি ১০০টি কেন্দ্রের নাম দিতে পারেন এবং দুপুর ১২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ওই কেন্দ্রগুলির CCTV ফুটেজ প্রকাশ করা হোক। তাঁর অভিযোগ, ওই সময়ের মধ্যে বুথের ভিতরে তৃণমূলের এজেন্টদের মারধর এবং ভোট লুটের ঘটনা ঘটেছিল।
ভবানীপুরের প্রসঙ্গও তোলেন মমতা। তাঁর দাবি, তিনি সেখানে প্রায় ১৫ হাজার ভোটে এগিয়ে ছিলেন, কিন্তু তাঁকে মারধর করা হয়েছিল এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। EVM হ্যাক করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। জ্ঞানেশ কুমার ফল প্রকাশের পরে মিষ্টি বিলি করেছিলেন—এমন দাবিও করেন মমতা। এই অভিযোগগুলির কোনও স্বাধীন প্রমাণ বা নির্বাচন কমিশনের পাল্টা বক্তব্য আনন্দবাজারের সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।
বিরোধী জোটের বৈঠকেও জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি উঠেছে। আনন্দবাজারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে হওয়া বৈঠকে কংগ্রেস, তৃণমূল, সিপিএম-সহ মোট ১৯টি বিজেপি-বিরোধী দল উপস্থিত ছিল। নির্বাচন কমিশনের অন্দরের মতবিরোধ নিয়ে The Indian Express-এর একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিরোধী দলগুলি জ্ঞানেশের পদত্যাগের দাবি আরও জোরালো করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তি নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। আনন্দবাজারের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, গত ১০ মাসে কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে দুই নির্বাচন কমিশনার একাধিক বার আপত্তি জানিয়েছেন। সেই রিপোর্টের পরই বিরোধীদের তরফে জ্ঞানেশ কুমারকে নিয়ে রাজনৈতিক চাপ আরও বেড়েছিল।
তবে মমতা-অভিষেকের বৃহস্পতিবারের বক্তব্যের ক্ষেত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট—জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবি এবং ভোটে অনিয়মের অভিযোগ রাজনৈতিক পক্ষের বক্তব্য। সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলির সত্যতা নির্ধারণের জন্য নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, নথি এবং প্রয়োজন হলে আদালতের পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এদিকে, মমতার ‘২০২৯-এর আগেই সুখবর’ মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক জল্পনা তৈরি হলেও তিনি কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ঘটনার কথা বলেননি। তাঁর বক্তব্যের প্রেক্ষাপট ছিল পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিরোধী জোটের আন্দোলন এবং জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবি।
এই মুহূর্তে মূল বিষয়গুলি:
- জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবি ফের তুলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
- ২০২৯-এর আগেই বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন মমতা, তবে নির্দিষ্ট কোনও ঘটনার কথা বলেননি।
- অভিষেকের দাবি, অন্তত ১৫০টি বিধানসভা কেন্দ্রে SIR-এ বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা বিজেপির জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি।
- নতুন ভোটারের নাম যোগ করা নিয়েও অভিষেক অভিযোগ তুলেছেন।
- ভোটকেন্দ্রের CCTV ফুটেজ প্রকাশের দাবি ফের জানিয়েছেন তিনি।
- নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এই প্রতিবেদনে ওই অভিযোগগুলির কোনও বিস্তারিত পাল্টা বক্তব্য উল্লেখ নেই।



