আপত্তি RSS-এর শিক্ষক সংগঠনের, ঢাকুরিয়ার স্কুল থেকে সরল মার্কস-মাওয়ের ছবি

অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসঙ্ঘের আপত্তির পর ঢাকুরিয়ার লেক ভিউ স্কুল থেকে কার্ল মার্কস ও মাও সে তুংয়ের ছবি সরানো হয়েছে বলে একাধিক রিপোর্টে জানা গিয়েছে।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

কলকাতার ঢাকুরিয়ার একটি বেসরকারি স্কুলে কার্ল মার্কস, মাও সে তুং এবং হো চি মিনের ছবি ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসঙ্ঘের প্রতিনিধিরা ছবিগুলি নিয়ে আপত্তি জানানোর পর লেক ভিউ স্কুল কর্তৃপক্ষ সেগুলির কয়েকটি সরিয়ে দিয়েছে। স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জানিয়েছেন, বহু বছর ধরেই ছবিগুলি স্কুলে ছিল।

বুধবার স্কুলে গিয়ে শিক্ষক সংগঠনের প্রতিনিধিরা টিচার্স রুম-সহ স্কুলের বিভিন্ন জায়গায় থাকা কয়েকজন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ছবি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁদের বক্তব্য, দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ছবি যেখানে নেই, সেখানে বিদেশি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ছবি কেন রাখা হয়েছে, তা নিয়ে তাঁদের আপত্তি রয়েছে।

এর পরেই স্কুল কর্তৃপক্ষ কার্ল মার্কস ও মাও সে তুংয়ের ছবি সরিয়ে দেয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে হো চি মিনের ছবির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। স্কুলের তরফে জানানো হয়েছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে অন্যান্য ছবির বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

কী নিয়ে আপত্তি শিক্ষক সংগঠনের?

অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসঙ্ঘের কলকাতা জেলা সভাপতি প্রদীপ পাল দাবি করেছেন, স্কুলে মাও সে তুং, কার্ল মার্কস, হো চি মিন, চে গুয়েভারা এবং জোসেফ স্ট্যালিনের মতো ব্যক্তিত্বদের ছবি রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালাম, বি আর আম্বেদকর বা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ছবি সেখানে দেখা যায়নি।

প্রদীপ পালের বক্তব্য অনুযায়ী, স্কুলের করিডর, স্টাফরুম এবং প্রধানশিক্ষকের ঘরের আশপাশে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ছবি ছিল। বিষয়টি নিয়ে তিনি স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে আপত্তি জানান। তবে সংগঠনের প্রতিনিধিরা নিজেরা কোনও ছবি সরাননি বলে জানিয়েছেন; স্কুল কর্তৃপক্ষই পরে ছবিগুলি খুলে দেয়।

তাঁর আরও অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে স্কুলে এই ধরনের ছবি থাকলেও বিষয়টি নিয়ে আগে কোনও পদক্ষেপ হয়নি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, শিক্ষাঙ্গনে এই ছবিগুলির উপস্থিতির মাধ্যমে পড়ুয়াদের কী ধরনের ভাবনা বা দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হচ্ছে।

তবে এই বক্তব্যগুলি শিক্ষক সংগঠনের দাবি। স্কুল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এমন কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি যে ছবিগুলি পড়ুয়াদের কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছিল।

কী বলছে লেক ভিউ স্কুল?

লেক ভিউ স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুদীপ্ত দে জানিয়েছেন, তিনি চলতি বছরের মে মাসের শেষ দিকে দায়িত্ব নিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ছবিগুলি তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার অনেক আগে থেকেই স্কুলে ছিল। এতদিন কোনও ছাত্র, অভিভাবক বা আধিকারিক এ বিষয়ে আপত্তি জানাননি বলেই বিষয়টি নিয়ে আলাদা করে পদক্ষেপ করা হয়নি।

শিক্ষক সংগঠনের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানোর পর বিষয়টি নতুন করে নজরে আসে বলে জানিয়েছেন তিনি। স্কুল কর্তৃপক্ষ ছবিগুলি সরানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য ব্যক্তিত্বের ছবি স্কুলে রাখা হবে বলেও জানান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে সুদীপ্ত দে-কে উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে, তিনি সাত দিনের মধ্যে স্কুলের বিভিন্ন জায়গায় থাকা এই ধরনের ছবিগুলি সরিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন। পাশাপাশি ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর ছবি স্কুলে টাঙানোর কথাও জানিয়েছেন তিনি।

শুধু মার্কস-মাও নয়, আরও কয়েকটি ছবি নিয়ে প্রশ্ন

এই বিতর্ক শুধু কার্ল মার্কস বা মাও সে তুংয়ের ছবি ঘিরে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষক সংগঠনের প্রতিনিধিরা হো চি মিন, চে গুয়েভারা, স্ট্যালিন, ভেনেজুয়েলার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজ এবং আরও কয়েকজন ব্যক্তিত্বের ছবির উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বলে একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

অন্যদিকে, স্কুলে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের ছবি থাকার কথাও প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসেছে। আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে স্কুলে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, ঋষি অরবিন্দ, জীবনানন্দ দাশ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কিশোর কুমার-সহ বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের ছবি থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে স্কুলে কোন কোন ব্যক্তিত্বের ছবি রাখা হবে, তা নিয়ে এখন নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

রাজনৈতিক বিতর্কের আবহ

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং শিক্ষাঙ্গনে প্রতীক ব্যবহারের প্রশ্ন সামনে এসেছে। একদিকে শিক্ষক সংগঠনটি জাতীয় ব্যক্তিত্বদের ছবি না থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, অন্যদিকে স্কুল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, ছবিগুলি বহু বছর ধরে সেখানে ছিল এবং এতদিন কোনও আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানানো হয়নি।

এদিকে, বামপন্থী শিক্ষক সংগঠন বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতি এই ঘটনাকে ভিন্নভাবে দেখেছে। তাদের বক্তব্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভারত ও বিশ্বের বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের ছবি থাকা নিয়ে আপত্তির কারণ নেই। অর্থাৎ ছবিগুলি সরানোর ঘটনাকে ঘিরে শিক্ষক সংগঠনগুলির মধ্যেও মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।

এখন দেখার বিষয়, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে লেক ভিউ স্কুলে কোন কোন ব্যক্তিত্বের ছবি রাখা হয় এবং স্কুল কর্তৃপক্ষ ছবিগুলি প্রদর্শনের ক্ষেত্রে কোনও নির্দিষ্ট নীতি তৈরি করে কি না।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন