অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের চারটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নিয়ে মামলায় সুপ্রিম কোর্টে আপাতত স্বস্তি পেল না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী। কলকাতা হাইকোর্টের অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করেনি দেশের সর্বোচ্চ আদালত। ফলে ওই চারটি অ্যাকাউন্টে যে ডেবিট-ফ্রিজ রয়েছে, তা আপাতত বহাল থাকছে। একইসঙ্গে কলকাতা হাইকোর্টকে মামলাটি দ্রুত শুনে নিষ্পত্তির দিকে এগোনোর অনুরোধ করেছে সুপ্রিম কোর্ট।
এই চারটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত Indian Bank-এ। আদালতে আগের শুনানিতে তৃণমূলের তরফে জানানো হয়েছিল, ওই চার অ্যাকাউন্টে মোট প্রায় ৮০৪ কোটি টাকা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের সাইবার শাখার পদক্ষেপের পর ৭ জুলাই অ্যাকাউন্টগুলিতে ডেবিট-ফ্রিজ করা হয়েছিল বলে কলকাতা হাইকোর্টের শুনানিতে উঠে আসে।
তৃণমূলের মমতা-গোষ্ঠী ওই অ্যাকাউন্টগুলি পরিচালনার অনুমতি চেয়ে প্রথমে কলকাতা হাইকোর্টে যায়। ২৭ অগস্ট হাইকোর্ট অন্তর্বর্তীভাবে সেই অনুমতি দেয়নি। এরপরই বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে যায়। ১ অক্টোবর সর্বোচ্চ আদালতও হাইকোর্টের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করেনি।
মামলাটির সূত্রপাত পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের সাইবার ক্রাইম শাখায় দায়ের হওয়া একটি অভিযোগ থেকে। ১৮ জুন ২০২৬-এ তৃণমূলের তিনটি HDFC অ্যাকাউন্টকে ঘিরে অভিযোগের ভিত্তিতে FIR দায়ের হয়েছিল। পরে তদন্তের পর আরও কয়েকটি অ্যাকাউন্টে ডেবিট-ফ্রিজের পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
তৃণমূলের দাবি, অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার সিদ্ধান্তের ভিত্তি যথেষ্ট নয় এবং দলীয় কার্যক্রম চালানোর ক্ষেত্রে এর ফলে বড় সমস্যা তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে তদন্তকারী সংস্থার তরফে অ্যাকাউন্টগুলিতে সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তুলে তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। এই অভিযোগগুলির সত্যতা এখনও আদালতে চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি।
তৃণমূলের হয়ে আইনজীবী অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি আদালতে দলের দৈনন্দিন খরচের বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, একটি রাজনৈতিক দলকে শুধু কর্মীদের বেতন বা বাড়িভাড়া মেটালেই চলে না; বিভিন্ন সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্যও অর্থের প্রয়োজন হয়।
তৃণমূলের আইনজীবীর দাবি অনুযায়ী, দলের মাসিক খরচের পরিমাণ ১২ কোটিরও বেশি। বার্ষিক খরচের পরিমাণও কয়েকশো কোটি টাকা বলে আদালতে জানানো হয়। চারটি Indian Bank অ্যাকাউন্টে থাকা অর্থ ব্যবহার করতে না পারলে দলের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে—এই যুক্তিতেই অ্যাকাউন্টগুলি পরিচালনার অনুমতি চাওয়া হয়েছিল।
এর আগে কলকাতা হাইকোর্ট তিনটি HDFC অ্যাকাউন্ট থেকে সীমিত অর্থ ব্যবহারের জন্য বিশেষ আধিকারিক নিয়োগ করেছিল। সেই ব্যবস্থার আওতায় দলের দৈনন্দিন খরচ, কর্মীদের বেতন এবং ভাড়া মেটানোর অনুমতি রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টও ওই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করেনি।
রাজ্যের তরফে অ্যাডভোকেট জেনারেল পক্ষের আইনজীবী তদন্তাধীন আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি আদালতের সামনে তুলে ধরেন। পুলিশের দাবি, অ্যাকাউন্টগুলিতে কিছু নগদ জমা এবং বিভিন্ন সংস্থায় অর্থ স্থানান্তরের বিষয় তদন্তের আওতায় রয়েছে।
আগের হাইকোর্ট শুনানিতে রাজ্যের পক্ষ থেকে কিছু নির্দিষ্ট লেনদেনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে এগুলি তদন্তকারী পক্ষের অভিযোগ ও আদালতে দেওয়া বক্তব্য; এখনও এগুলিকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখা হয়নি।
এই মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল চারটি Indian Bank অ্যাকাউন্টে থাকা অর্থের পরিমাণ। তৃণমূলের তরফে হাইকোর্টে জানানো হয়েছিল, চার অ্যাকাউন্টে মোট প্রায় ৮০৪ কোটি টাকা রয়েছে। এই অর্থ ব্যবহার করতে না পারার ফলে দলের সাংগঠনিক কাজকর্মে সমস্যা হচ্ছে বলেও দাবি করা হয়েছিল।
তবে হাইকোর্ট তখন জানিয়েছিল, আগে থেকেই তিনটি অন্য অ্যাকাউন্ট থেকে সীমিতভাবে দৈনন্দিন খরচ চালানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে নতুন চারটি অ্যাকাউন্টও সম্পূর্ণভাবে পরিচালনার অনুমতি দিলে আগের অন্তর্বর্তী নির্দেশের সঙ্গে অসঙ্গতি তৈরি হতে পারে। সেই কারণেই ২৭ অগস্ট অতিরিক্ত অন্তর্বর্তী স্বস্তি দেয়নি আদালত।
সুপ্রিম কোর্টের ১ অক্টোবরের সিদ্ধান্তের ফলে চারটি Indian Bank অ্যাকাউন্টের ডেবিট-ফ্রিজ আপাতত উঠছে না। অর্থাৎ ওই অ্যাকাউন্টগুলি থেকে তৃণমূলের মমতা-গোষ্ঠী নিজেদের ইচ্ছামতো অর্থ তুলতে বা লেনদেন করতে পারবে না।
তবে এই সিদ্ধান্তে মামলার মূল বিতর্কের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। সুপ্রিম কোর্ট কলকাতা হাইকোর্টকে বিষয়টি দ্রুত শুনতে বলেছে। ফলে তদন্ত, অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার বৈধতা এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন নিয়ে পরবর্তী শুনানিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, তৃণমূলের দলীয় নাম ও প্রতীক নিয়েও নির্বাচন কমিশনের সামনে পৃথক বিরোধ চলছে। সেই প্রেক্ষাপটে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত মামলাটিও দলের সাংগঠনিক ও আর্থিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে দুই মামলার আইনি বিষয় আলাদা এবং একটির সিদ্ধান্ত দিয়ে অন্যটির ফল নির্ধারিত হয় না।



