জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে FIR মহুয়ার, আদালত অবমাননার মামলার উদ্যোগও

জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে মহুয়া মৈত্রের অভিযোগ ঘিরে নতুন করে বিতর্ক নির্বাচন কমিশনে।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় এফআইআর দায়ের করেছেন কৃষ্ণনগরের তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র। একই দিনে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্রজেশ সিং জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা শুরু করার অনুমতি চেয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল আর ভেঙ্কটরামানিকে চিঠি দিয়েছেন।

মহুয়ার অভিযোগ, ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন বা SIR প্রক্রিয়ায় একাধিক সিদ্ধান্তে আইন ও বিধি লঙ্ঘন হয়েছে। তাঁর দাবি, এই অভিযোগগুলির তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে। তবে এগুলি বর্তমানে মহুয়ার করা অভিযোগ; FIR দায়ের বা মামলা করার উদ্যোগ নিজে থেকে অভিযোগ প্রমাণ করে না।

এই আইনি পদক্ষেপের পটভূমিতে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে মতপার্থক্য নিয়ে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ২৩ সেপ্টেম্বরের তদন্তমূলক প্রতিবেদন। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার কমিশনের সিদ্ধান্ত বা নির্দেশ নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁদের আপত্তির মধ্যে ভোটার তালিকায় নতুন নাম অন্তর্ভুক্তি, নাম বাদ দেওয়া, Form 6-এর পরিবর্তন এবং ভোটার ডেটাবেস ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় ছিল।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, দুই নির্বাচন কমিশনারের কয়েকটি আপত্তি ছিল এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে, যা তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী তাঁদের জ্ঞান বা অনুমোদন ছাড়াই নেওয়া হয়েছিল। চারটি আপত্তি একই দিনে জানানো হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পর নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়। বিরোধী দলগুলির একাধিক নেতা জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তোলেন। অন্য দিকে, নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় বিভিন্ন মতামত বা পর্যবেক্ষণ উঠে আসা স্বাভাবিক এবং সমস্ত সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত ঐকমত্যের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে।

মহুয়া মৈত্রের অভিযোগের অন্যতম বিষয় SIR চলাকালীন Form 6-এ নতুন ভোটারদের কাছ থেকে অতিরিক্ত তথ্য চাওয়ার প্রক্রিয়া। তাঁর দাবি, নতুন ভোটারের বাবা-মা বা ঠাকুরদা-ঠাকুমা আগের SIR-এর ভোটার তালিকায় ছিলেন কি না, সেই তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছিল। মহুয়ার বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট বিধি পরিবর্তন না করে এ ধরনের অতিরিক্ত শর্ত আরোপ করা যায় না।

তিনি আরও অভিযোগ করেছেন, পশ্চিমবঙ্গের SIR-এ বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রায় ১৬.১০ লক্ষ নামের বিরুদ্ধে কারা আপিল করেছেন, সেই তথ্যও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি ভোটার তালিকার তথ্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের আইটি বিভাগের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের তদন্তেও Form 6 নিয়ে দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তির কথা উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন ভোটারদের জন্য ব্যবহৃত এই বিধিবদ্ধ ফর্মে পরিবর্তন আনা এবং ভোটার ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণ আরও কেন্দ্রীয় করার বিষয়ে তাঁরা প্রশ্ন তুলেছিলেন।

অন্য দিকে, ব্রজেশ সিংয়ের চিঠির বিষয়টি আদালত অবমাননার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। সুপ্রিম কোর্টে ফৌজদারি আদালত অবমাননার প্রক্রিয়া শুরু করার আগে অ্যাটর্নি জেনারেল বা সলিসিটর জেনারেলের লিখিত সম্মতি প্রয়োজন। সেই কারণেই অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে অনুমতি চাওয়া হয়েছে।

আইনজীবীর অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের মতো একটি বহু-সদস্যের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাজকর্ম সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী রায়গুলিতে যে কাঠামো ও নীতির কথা বলা হয়েছে, তার সঙ্গে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলির সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই আদালত অবমাননার প্রক্রিয়া শুরু করার অনুমতি চাওয়া হয়েছে।

তবে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যও এই বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ। কমিশন জানিয়েছে, কমিশনারদের মধ্যে মতামতের পার্থক্য থাকতেই পারে এবং তা সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। একই সঙ্গে কমিশনের দাবি, গত এক বছরে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলিতে তিন কমিশনারেরই অনুমোদন ছিল।

ফলে জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বিতর্ক এখন রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি আইনি ক্ষেত্রেও পৌঁছেছে। এক দিকে মহুয়ার FIR এবং অন্য দিকে আদালত অবমাননার প্রক্রিয়া শুরুর অনুমতি চেয়ে আবেদন—দুই পদক্ষেপেরই পরবর্তী আইনি অগ্রগতি এখন নজরে থাকবে। পাশাপাশি SIR এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলিরও আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্পত্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন