উৎসবের মরসুমের আগে ফের চিন্তা বাড়াল দেশের মূল্যবৃদ্ধির পরিস্থিতি। অগস্টে ভারতের পাইকারি মুদ্রাস্ফীতির হার বেড়ে পৌঁছেছে ৯.৯২ শতাংশে। জুলাইয়ে এই হার ছিল ৯.৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে ফের ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে পাইকারি মূল্যসূচক। জ্বালানি, খাদ্যদ্রব্য, মৌলিক ধাতু এবং রাসায়নিক পণ্যের খরচ বৃদ্ধিকেই এর অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে কেন্দ্র।
সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর পাইকারি মুদ্রাস্ফীতির পরিসংখ্যান প্রকাশ করে কেন্দ্র। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের অগস্টে খাদ্য সূচকের মুদ্রাস্ফীতির হার বেড়ে হয়েছে ৭.০৫ শতাংশ। জুলাইয়ে এই হার ছিল ৬.৬৫ শতাংশ। ফলে খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রেও এক মাসে মূল্যবৃদ্ধির চাপ আরও বেড়েছে।
উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গিয়েছে। অগস্টে এই খাতে পাইকারি মূল্যবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৮.৩৭ শতাংশ। জুলাইয়ে তা ছিল ৮.২৯ শতাংশ। অর্থাৎ খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি উৎপাদিত সামগ্রীর ক্ষেত্রেও পাইকারি দামের চাপ ক্রমশ বাড়ছে।
সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের পরিসংখ্যান। অগস্টে এই ক্ষেত্রে পাইকারি মূল্যসূচক পৌঁছেছে ২২.৯৩ শতাংশে। কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, খনিজ তেল, খাদ্যদ্রব্য, মৌলিক ধাতু এবং রাসায়নিক দ্রব্য উৎপাদনের আমদানি খরচ বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে পাইকারি মুদ্রাস্ফীতির অঙ্কে।
পাইকারি বাজারে মূল্যবৃদ্ধির এই চাপ শেষ পর্যন্ত খুচরো বাজারেও কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেদিকেই নজর অর্থনীতিবিদদের। কারণ পাইকারি পণ্যের দাম দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকলে তার প্রভাব পড়তে পারে সরবরাহ শৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরে। এর ফলে আগামী দিনে চাল, ডাল, তেল, নুনের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
তবে পাইকারি মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে খুচরো মুদ্রাস্ফীতির হিসাব এক নয়। কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ও বাস্তবায়ন মন্ত্রকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে খুচরো মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল ৪.৪৫ শতাংশ। আমদানি খরচ ও বিভিন্ন পণ্যের দামের গতিপ্রকৃতির কারণে আগামী দিনে খুচরো বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
চলতি আর্থিক বছর ২০২৬-’২৭-এর শুরু থেকেই পাইকারি মুদ্রাস্ফীতির সূচকে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের ওঠানামা ভারতের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব পরিবহণ থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদন এবং বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহ খরচেও পড়তে পারে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, হরমুজ় প্রণালী ঘিরে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির জেরে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ভারতের অপরিশোধিত তেলের চাহিদার বড় অংশই আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১০০ ডলারের উপরে থাকলে দেশের আমদানি ব্যয়ের উপরও চাপ বাড়তে পারে।
এর পাশাপাশি সারের দাম বৃদ্ধির প্রভাবও কৃষি উৎপাদন এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের দামের উপর পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকদের একাংশের মত। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারের জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম থেকে শুরু করে কৃষি উৎপাদনের খরচ—একাধিক কারণই দেশের মূল্যবৃদ্ধির ছবিকে প্রভাবিত করতে পারে।
জুলাইয়ের মুদ্রানীতি কমিটির বৈঠকে এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাবের কথাও উল্লেখ করেছে ভারতীয় রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক (RBI)। আবহাওয়াজনিত কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে খাদ্যপণ্যের সরবরাহে তার প্রভাব পড়তে পারে। সেই পরিস্থিতিতে চলতি আর্থিক বছরে খুচরো মুদ্রাস্ফীতির হার প্রায় ৫ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এখন সামনে দুর্গাপুজো-সহ একাধিক উৎসব। সেই সময় বাজারে পণ্যের চাহিদা সাধারণত বাড়ে। ফলে পাইকারি বাজারে মূল্যবৃদ্ধির এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কতটা খুচরো বাজারে প্রতিফলিত হয়, তার উপরই নির্ভর করবে সাধারণ মানুষের সংসারের খরচের চাপ। আপাতত ৯.৯২ শতাংশের পাইকারি মুদ্রাস্ফীতির পরিসংখ্যান উৎসবের আগে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে নতুন করে নজর কেড়েছে।



