দিশা সালিয়ান মৃত্যু মামলায় নতুন মোড়, কী কী রয়েছে সিবিআইয়ের এফআইআরে?

দিশা সালিয়ানের মৃত্যু নিয়ে নতুন অভিযোগের ভিত্তিতে FIR দায়ের করেছে CBI। গণধর্ষণ, হত্যা, প্রমাণ লোপাট ও ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখবে কেন্দ্রীয় সংস্থা।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

প্রয়াত অভিনেতা সুশান্ত সিংহ রাজপুতের (Sushant Singh Rajput) প্রাক্তন ম্যানেজার দিশা সালিয়ানের (Disha Salian) মৃত্যু ঘিরে ফের তীব্র চাঞ্চল্য। তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে এফআইআর দায়ের করেছে সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (CBI)। ২ সেপ্টেম্বর বম্বে হাই কোর্টের (Bombay High Court) নির্দেশের পর দিশার বাবা সতীশ সালিয়ানের দেওয়া নতুন অভিযোগের ভিত্তিতেই এই মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এফআইআরে একাধিক রাজনৈতিক নেতা, অভিনেতা ও পুলিশকর্তার ভূমিকা খতিয়ে দেখার কথা বলা হয়েছে।

CBI-এর নথি অনুযায়ী, দিশার মৃত্যুর ঘটনায় গণধর্ষণ, হত্যা, প্রমাণ লোপাট এবং ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের আড়াল করার অভিযোগের তদন্ত করা হবে। সরকারি কর্মীদের বিরুদ্ধে নথি বিকৃত করা বা আইনগত নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগও এফআইরে উল্লেখ রয়েছে।

তবে এই পর্যায়ে একটি বিষয় স্পষ্ট। এফআইআরে কোনও ব্যক্তিকে সরাসরি অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। তদন্তের প্রয়োজনে যাঁদের ভূমিকা সামনে এসেছে, তাঁদের সম্পর্কে তথ্য-প্রমাণ খতিয়ে দেখা হবে। পর্যাপ্ত প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত কাউকে অভিযুক্ত হিসেবে গণ্য না করার নির্দেশও রয়েছে আদালতের।

দিশার বাবা সতীশ সালিয়ান গত শুক্রবার মুম্বইয়ের বান্দ্রা-কুর্লা কমপ্লেক্সে CBI দফতরে গিয়ে বিস্তারিত বিবৃতি দেন। তাঁর সেই নতুন বয়ানের ভিত্তিতেই রবিবার এফআইআর দায়ের করা হয়েছে বলে সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। হাই কোর্টে করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে এই তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

২০২০ সালের ৮ জুন মৃত্যু হয়েছিল দিশার। মুম্বইয়ের মালাড এলাকার একটি বহুতল আবাসনের ১৪ তলা থেকে পড়ে তাঁর মৃত্যু হয়। সেই সময় মুম্বই পুলিশ (Mumbai Police) অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা নথিভুক্ত করেছিল।

প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানিয়েছিল, ময়নাতদন্তে ধর্ষণ বা যৌন হেনস্থার কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একইসঙ্গে ষড়যন্ত্র বা অন্য কোনও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রমাণও তদন্তে মেলেনি বলে আদালতকে জানানো হয়েছিল। পুলিশের বক্তব্য ছিল, পারিবারিক সমস্যা ও কাজের চাপের কারণে দিশা মানসিক ভাবে অস্থির ছিলেন।

কিন্তু পরে দিশার বাবা সেই তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর দাবি ছিল, মেয়েকে যৌন নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছিল এবং ঘটনার নেপথ্যে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যোগ থাকতে পারে। তাঁর আইনজীবীও আদালতে এই মৃত্যুকে একটি বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ করেছিলেন।

সতীশের অভিযোগে তৎকালীন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরে (Uddhav Thackeray)-সহ কয়েক জনের বিরুদ্ধে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে। এফআইআরে আরও বেশ কয়েক জনের নাম এসেছে, যাঁদের মধ্যে রয়েছেন আদিত্য ঠাকরে (Aaditya Thackeray), দিশার তৎকালীন বাগ্‌দত্ত রোহন রায়, অভিনেতা ডিনো মোরিয়া (Dino Morea) ও সূরজ পাঞ্চোলি (Sooraj Pancholi)।

এছাড়াও দিশার সঙ্গে সুশান্তের সম্পর্কের সূত্র ধরে অভিনেতার তৎকালীন প্রেমিকা রিয়া চক্রবর্তী (Rhea Chakraborty) ও তাঁর ভাইয়ের নাম, প্রাক্তন পুলিশ আধিকারিক সচিন ওয়াজে (Sachin Waze), মুম্বইয়ের তৎকালীন পুলিশ কমিশনার পরমবীর সিংহ (Param Bir Singh), ডেপুটি কমিশনার বিশাল ঠাকুর এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনিল দেশমুখ (Anil Deshmukh)-এর নামও এফআইআরে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এফআইআরে নাম থাকা মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অপরাধে অভিযুক্ত বা দোষী—এমনটা নয়। CBI তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলির সত্যতা এবং প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা যাচাই করবে। সূরজ পাঞ্চোলি অবশ্য তাঁর নাম দিশার মৃত্যুর সঙ্গে জড়ানোকে অন্যায় ও হতাশাজনক বলে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

তদন্তের আওতায় শুধু রাজনৈতিক নেতা বা অভিনেতারাই নন। দিশার মৃত্যুর প্রথম দিকের তদন্তে যুক্ত পুলিশকর্তা, ময়নাতদন্তে দেরির জন্য দায়ী বলে অভিযোগ ওঠা চিকিৎসক ও কর্মী, ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরির আধিকারিক, সংশ্লিষ্ট আবাসনের নিরাপত্তারক্ষী এবং রাজ্যের বিশেষ তদন্তকারী দলের (SIT) সদস্যদের ভূমিকা নিয়েও অনুসন্ধানের দাবি করা হয়েছে।

এফআইআরে দিশার মোবাইল ফোন নিয়েও একাধিক অসঙ্গতির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ৯ জুন সকাল নাগাদ পুলিশ ফোনটি নিজেদের হেফাজতে নেয়। পরে সেটি ফের চালু করে ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে পুলিশের বক্তব্যের সঙ্গে অন্যান্য তথ্যের অসঙ্গতির অভিযোগ তোলা হয়েছে।

সতীশ সালিয়ানের অভিযোগ, ফোনের তথ্য ও যোগাযোগের সূত্র ব্যবহার করে সম্ভাব্য সাক্ষীদের চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং তাঁদের কেউ কেউ চাপ বা হুমকির মুখে পড়েছিলেন। ফোনের ডেটা মুছে ফেলা বা পরিবর্তন করে প্রমাণ নষ্ট করার অভিযোগও এফআইআরে রয়েছে। তবে এগুলি বর্তমানে অভিযোগের অংশ এবং তদন্তের মাধ্যমেই এর সত্যতা যাচাই হওয়ার কথা।

দিশার মৃত্যুর মাত্র ছ’দিন পর, ২০২০ সালের ১৪ জুন সুশান্ত সিংহ রাজপুতকে মুম্বইয়ের বান্দ্রার বাড়িতে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। দুই ঘটনার সময়ের ব্যবধান ঘিরেই তখন থেকেই নানা প্রশ্ন ও জল্পনা তৈরি হয়েছিল। পরে সুশান্তের মৃত্যুর তদন্তও CBI-এর হাতে যায়।

তবে সুশান্তের মামলায় CBI-এর চূড়ান্ত রিপোর্টে তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল এবং তদন্তে আত্মহত্যা ছাড়া অন্য কোনও দিকের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়েছিল। দিশা সালিয়ানের মৃত্যু নিয়ে এবার নতুন করে CBI তদন্ত শুরু হওয়ায় পুরনো সেই ঘটনাক্রমও ফের আলোচনায় এসেছে।

দিশা সালিয়ানের মৃত্যু নিয়ে এতদিনের নানা দাবি, পুলিশের পুরনো তদন্ত এবং পরিবারের নতুন অভিযোগ—সবকিছুকেই সামনে রেখে এবার তদন্ত এগোবে। এফআইআরে ওঠা অভিযোগগুলির মধ্যে কোনটির পক্ষে প্রমাণ মেলে এবং কারও বিরুদ্ধে আদৌ কোনও ফৌজদারি দায় প্রতিষ্ঠিত হয় কি না, তার উত্তর মিলবে CBI-এর তদন্ত শেষ হওয়ার পরই।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন