মুম্বইয়ের ২৬/১১ হামলার ১৮ বছর পর নতুন করে সামনে এল পাকিস্তানের তদন্তকারী সংস্থা ফেডেরাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (FIA)-র নথি। আপডেট করা ‘Red Book’-এ ২০০৮ সালের মুম্বই হামলার সঙ্গে যুক্ত ১৯ জনের নাম রাখা হয়েছে। এই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হামলাকারীদের সমুদ্রপথে ভারতে পৌঁছতে সাহায্য করা, নৌকা জোগাড় করা এবং হামলার জন্য অর্থ জোগানোর অভিযোগ রয়েছে।
নতুন তালিকায় থাকা তথ্য অনুযায়ী, ২৬/১১ হামলার ১০ হামলাকারী পাকিস্তান থেকে সমুদ্রপথে মুম্বই পৌঁছেছিল। তাদের ব্যবহৃত ‘আল-হুসেইনি’ এবং ‘আল-ফৌজ’ নামে দুই নৌকার ব্যবস্থা ও যাত্রাপথে সহায়তার সঙ্গে ১১ জনের নাম যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি হামলার অর্থ জোগানের সঙ্গে যুক্ত আরও ছয়জনের নাম রয়েছে বলে সাম্প্রতিক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
FIA-র নতুন Red Book-এ ১৯ জনের মধ্যে ১৭ জনের ছবি, নাম এবং ২৬/১১ হামলায় তাঁদের কথিত ভূমিকার উল্লেখ রয়েছে। তবে দু’জনের ক্ষেত্রে আগের নথির তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ দেওয়া হয়েছে। ২০২১ সালের তালিকায় তাঁদের ছবি, লস্কর-ই-তইবার সঙ্গে যোগ এবং অপারেশনাল ভূমিকার উল্লেখ ছিল বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।
নতুন তালিকায় থাকা ১১ জনকে হামলাকারীদের সমুদ্রযাত্রায় সহযোগিতাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মহম্মদ আমজাদ খান, শাহিদ গফুর, মহম্মদ উসমান, আতীক-উর-রহমান, রিয়াজ আহমেদ, মহম্মদ মুস্তাক, মহম্মদ নইম, আবদুল শুকুর, মহম্মদ সাবির সালফি, মহম্মদ উসমান এবং শাকিল আহমেদ। রিপোর্ট অনুযায়ী, এঁদের বিরুদ্ধে আল-হুসেইনি ও আল-ফৌজ নৌকার মাধ্যমে হামলাকারীদের মুম্বই পৌঁছনোর ক্ষেত্রে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে।
তবে এই নতুন নথিকে পাকিস্তানের তরফে ২৬/১১ হামলার মূল ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ দায় স্বীকার হিসেবে দেখার আগে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ FIA-র তালিকায় হামলার অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে ভারতের দীর্ঘদিনের দাবিতে থাকা হাফিজ সইদের নাম নেই। একইভাবে নতুন তালিকায় অভিযুক্তদের সঙ্গে কোন জঙ্গি সংগঠনের সম্পর্ক রয়েছে, সেই তথ্যও সব ক্ষেত্রে একইভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
বিশেষ করে মহম্মদ খান ও আবদুল রহমানের ক্ষেত্রে ২০২১ সালের তালিকায় থাকা কিছু তথ্য নতুন সংস্করণে বাদ পড়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। মহম্মদ খানকে আল-হুসেইনি নৌকা সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত করা হলেও নতুন তালিকায় তাঁর ছবি, লস্কর-ই-তইবার সঙ্গে যোগ এবং অপারেশনাল ভূমিকার উল্লেখ নেই। আবদুল রহমানের ক্ষেত্রেও ছবি ও সংগঠনের সঙ্গে যোগ সংক্রান্ত তথ্য বাদ দেওয়া হয়েছে বলে রিপোর্টে দাবি।
২৬/১১ মুম্বই হামলার ঘটনায় পাকিস্তানের মাটিতে থাকা জঙ্গি নেটওয়ার্কের ভূমিকা নিয়ে ভারত দীর্ঘদিন ধরেই তথ্য ও নথি তুলে ধরেছে। নতুন FIA Red Book-এ হামলাকারীদের সমুদ্রপথে ভারতে পৌঁছতে সহায়তাকারী এবং অর্থ জোগানদাতাদের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সেই তদন্ত-সংক্রান্ত নথির গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে।
এর পাশাপাশি পাকিস্তান সম্প্রতি জইশ-ই-মহম্মদ প্রধান মাসুদ আজহারের বিরুদ্ধে পুরস্কারের অঙ্ক বাড়িয়েছে বলেও একাধিক রিপোর্টে উঠে এসেছে। ২৬/১১-সংক্রান্ত ১৯ জনের নাম এবং মাসুদ আজহারকে ঘিরে এই পদক্ষেপ এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন আন্তর্জাতিক স্তরে সন্ত্রাসে অর্থায়ন ও জঙ্গি সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
তবে এখানে FATF নিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত FATF-এর সরকারি তালিকায় পাকিস্তান increased monitoring বা তথাকথিত ‘গ্রে লিস্টে’ নেই। FATF-এর নিজস্ব পাকিস্তান পেজ অনুযায়ী, ২০২২ সালের অক্টোবরে দেশটিকে increased monitoring থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে নতুন Red Book প্রকাশকে সরাসরি ‘FATF-এর গ্রে লিস্টে ফেরার ভয়’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার মতো সরকারি তথ্য বর্তমানে নেই।
FATF অবশ্য সন্ত্রাসে অর্থায়ন এবং অর্থপাচার রুখতে দেশগুলির ব্যবস্থাপনা নিয়ে নিয়মিত মূল্যায়ন ও নজরদারি চালায়। ২০২৬ সালের জুনের সরকারি নথিতেও FATF জানিয়েছে, AML/CFT ব্যবস্থার কৌশলগত ঘাটতি থাকা দেশগুলিকে increased monitoring-এর আওতায় রাখা হয় এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলিকে নির্দিষ্ট অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়ন করতে হয়।
ফলে নতুন FIA Red Book-কে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ২৬/১১ হামলার সঙ্গে যুক্ত বলে চিহ্নিত ১৯ জনের নাম পাকিস্তানের সরকারি তদন্তকারী সংস্থার নথিতে জায়গা পেয়েছে। তবে তালিকায় কার কী ভূমিকা, কোন তথ্য রাখা হয়েছে এবং কোন তথ্য বাদ দেওয়া হয়েছে—সেই পার্থক্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নতুন নথি প্রকাশের পর ২০০৮ সালের মুম্বই হামলার পাকিস্তান-যোগ নিয়ে বিতর্ক আরও একবার আন্তর্জাতিক আলোচনায় ফিরে এসেছে।



