হাই ব্লাড প্রেশার (High Blood Pressure) ধরা পড়লেই নুন একেবারে বন্ধ করে দিতে হবে—এমন ধারণা অনেকেরই। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সোডিয়াম কমানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নুন সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া ঠিক নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে ৫ গ্রামের কম নুন, অর্থাৎ ২,০০০ মিলিগ্রামের কম সোডিয়াম খাওয়ার পরামর্শ দেয়। অন্যদিকে আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন (AHA) মোট সোডিয়াম ২,৩০০ মিলিগ্রামের নিচে রাখার এবং উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রে আদর্শ ভাবে ১,৫০০ মিলিগ্রামের দিকে যাওয়ার পরামর্শ দেয়।
তাহলে হিসাবটা কী দাঁড়াল? সোডিয়াম এবং নুন এক জিনিস নয়। সাধারণ খাবার নুনের প্রায় ৪০ শতাংশ সোডিয়াম। ফলে ১,৫০০ মিলিগ্রাম সোডিয়াম প্রায় ৩.৭৫ গ্রাম নুনের সমান। আর ২,০০০ মিলিগ্রাম সোডিয়াম প্রায় ৫ গ্রাম নুনের সমান। এই হিসাবের মধ্যে রান্না, টেবিলে দেওয়া নুন এবং প্যাকেটজাত খাবার থেকে পাওয়া সোডিয়াম—সবই ধরতে হবে।
নুন বেশি খেলে শরীরে সোডিয়ামের পরিমাণ বেড়ে যায়। অতিরিক্ত সোডিয়াম শরীরে জল ধরে রাখার প্রবণতা বাড়াতে পারে। এর ফলে রক্তের পরিমাণ ও রক্তনালির উপর চাপ বাড়তে পারে, যার সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্ক রয়েছে। গবেষণার প্রমাণও বলছে, সোডিয়াম কমালে প্রাপ্তবয়স্কদের রক্তচাপ কমতে পারে।
তবে শুধু রান্নার নুন কমালেই যে সোডিয়াম নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে, এমনটা নয়। আসল সমস্যা অনেক সময় লুকিয়ে থাকে প্যাকেটজাত এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারে। চিপস, চানাচুর, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, প্রসেসড মাংস, কিছু রুটি, সস, স্যুপ ও অন্যান্য প্যাকেটজাত খাবারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সোডিয়াম থাকতে পারে।
অর্থাৎ, ভাতের পাতে আলাদা করে কাঁচা নুন না খেলেও সারাদিনের খাবার থেকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সোডিয়াম শরীরে ঢুকে যেতে পারে। বিশেষ করে নিয়মিত প্যাকেটজাত খাবার, নোনতা স্ন্যাকস বা অতিরিক্ত সোডিয়ামযুক্ত সস খাওয়ার অভ্যাস থাকলে বিষয়টি নজরে রাখা জরুরি।
সেই কারণে বাজার থেকে কোনও প্যাকেটজাত খাবার কেনার সময় শুধু ‘লবণ’ লেখা আছে কি না, তা দেখলেই হবে না। Nutrition Facts বা পুষ্টির তালিকায় sodium-এর পরিমাণ কত রয়েছে, সেটিও দেখে নেওয়া দরকার। একই সঙ্গে রান্নার সময় নুনের পরিমাণ কমানো এবং টেবিলে আলাদা করে নুন না রাখার অভ্যাস সোডিয়াম গ্রহণ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
তবে ‘প্রেশার আছে মানেই নুন একেবারে বন্ধ’—এই সিদ্ধান্ত নিজের থেকে নেওয়া উচিত নয়। বয়স, কিডনির অবস্থা, হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা, অন্যান্য রোগ এবং আপনি কী ওষুধ খান, তার উপর খাদ্যাভ্যাসের প্রয়োজন বদলাতে পারে। বিশেষ করে কিডনি বা হৃদ্যন্ত্রের নির্দিষ্ট সমস্যা থাকলে সোডিয়াম বা পটাশিয়াম নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ আরও গুরুত্বপূর্ণ।
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নুন কমানো গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই একমাত্র উপায় নয়। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত ঘুম এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ—সব মিলিয়েই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। তাই নুন পুরোপুরি বন্ধ করার বদলে মোট সোডিয়াম গ্রহণ কতটা হচ্ছে, সেটাই নজরে রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত ভাবে আপনার জন্য নিরাপদ পরিমাণ জানতে চিকিৎসকের বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।



