‘দিমাগি নকশাল’ বলে জনতার প্রতিবাদকে দাগানো হচ্ছে, মোদীকে তীব্র আক্রমণ সিপিএমের

স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে ‘দিমাগি নকশাল’ মন্তব্যের পর প্রধানমন্ত্রী মোদীকে নিশানা সিপিএমের। এম এ বেবির অভিযোগ, সরকারের সমালোচক ও যন্তর মন্তরের প্রতিবাদকারীদেরও দাগানো হচ্ছে।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) ‘দিমাগি নকশাল’ মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র হল। সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি (M A Baby) অভিযোগ করেছেন, সরকারের সমালোচক এবং রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করা মানুষদের কলঙ্কিত করতেই এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁর দাবি, দিল্লির যন্তর মন্তরে যারা আন্দোলন করছেন, তাঁদেরও এই তকমা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

লালকেল্লা থেকে ১৫ অগস্টের ভাষণে মোদী বলেছিলেন, সশস্ত্র নকশালবাদের বিরুদ্ধে দেশের লড়াই শেষের পথে পৌঁছেছে। তবে তাঁর অভিযোগ, এখনও এমন কিছু মানুষ রয়েছেন, যাঁদের ‘দিমাগি নকশাল’ মানসিকতা রয়েছে এবং সুযোগ পেলেই তাঁরা হিংসা, অশান্তি ও দেশের গতিপথ বদলের চেষ্টা করেন। এই ধরনের লোকজনকে চিহ্নিত করে বিচ্ছিন্ন করার আহ্বানও জানান প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পরই পাল্টা সরব হন এম এ বেবি। তাঁর অভিযোগ, বিরোধীদের ‘দেশবিরোধী’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার রাজনীতি নতুন নয়। আগে ‘আরবান নকশাল’ শব্দটি ব্যবহার করা হত, এখন তার জায়গায় ‘দিমাগি নকশাল’ বলা হচ্ছে। সরকারের সমালোচনা করেন বা প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন—এমন মানুষদের নকশাল তকমা দেওয়া অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ বলেই মন্তব্য করেছেন তিনি।

বেবির বক্তব্য, যাঁরা সরকারের নীতির সমালোচনা করছেন কিংবা যন্তর মন্তরে প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন, তাঁদেরও ‘দিমাগি নকশাল’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। তাঁর মতে, এর মাধ্যমে রাজনৈতিক বিরোধিতা এবং সাধারণ মানুষের প্রতিবাদকে নকশালবাদের সঙ্গে এক করে দেখানোর চেষ্টা চলছে।

সিপিএম নেতা একইসঙ্গে অতীতে ‘আরবান নকশাল’ তকমা ঘিরে বিতর্কের কথাও টেনে আনেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে এম এম কালবুর্গি, গোবিন্দ পানসারে এবং গৌরী লঙ্কেশের হত্যার প্রসঙ্গ। বিজেপি ও আরএসএসের সমালোচকদের উপর হামলার অভিযোগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। অভিনেতা ও নাট্যকার গিরিশ কর্নাডের একটি অনুষ্ঠানে ‘আরবান নকশাল’ লেখা প্ল্যাকার্ড পরার ঘটনাও স্মরণ করেন বেবি।

শুধু ‘দিমাগি নকশাল’ মন্তব্য নয়, কেন্দ্রের নকশালবিরোধী অভিযান নিয়েও মোদী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে (Amit Shah) আক্রমণ করেন সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক। তাঁর অভিযোগ, অভিযানের সময় তরুণ-তরুণীদের আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে আনার পরিবর্তে গুলি করে পরে সেই মৃত্যুকে এনকাউন্টার হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই ধরনের অভিযানকে তিনি ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস’ বলে অভিহিত করেন।

তবে বেবি স্পষ্ট করেছেন, সিপিএম নকশালদের সশস্ত্র কার্যকলাপ সমর্থন করে না। তাঁর দাবি, যারা অস্ত্র ছেড়ে মূলস্রোতে ফিরতে চেয়েছে, তাদের সঙ্গে আলোচনা করে পুনর্বাসনের পথ খোলা রাখার পক্ষেই বামপন্থীরা ছিল। তিনি জানান, ডি রাজা (D Raja) এবং দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের (Dipankar Bhattacharya) সঙ্গে মিলে এই বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠিও দেওয়া হয়েছিল।

এদিকে মোদীর মন্তব্যকে কেন্দ্র করে শুধু সিপিএম নয়, কংগ্রেসও পাল্টা আক্রমণে নেমেছে। কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ (Jairam Ramesh) বলেছেন, আগে বিরোধীদের ‘আরবান নকশাল’ বলা হত, এখন ‘দিমাগি নকশাল’ বলা হচ্ছে। তাঁর দাবি, এই ধরনের মন্তব্য প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক অস্বস্তি ও হতাশারই প্রকাশ।

কংগ্রেস নেতা পি চিদম্বরম (P Chidambaram) আরও সরাসরি প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। মোদীর মন্তব্যের জবাবে তিনি নিজেকে ‘দিমাগি নকশাল’ বলে ব্যঙ্গ করেছেন। তাঁর বক্তব্য প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ারই অংশ।

সিপিআইয়ের সাধারণ সম্পাদক ডি রাজাও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, স্বাধীনতা দিবসের মতো গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চকে ব্যবহার করে মতবিরোধ ও সরকারের সমালোচনাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সমাজবাদী পার্টির সভাপতি অখিলেশ যাদবও (Akhilesh Yadav) প্রধানমন্ত্রীর স্বাধীনতা দিবসের ভাষণ নিয়ে আক্রমণ শানিয়েছেন।

এই রাজনৈতিক চাপানউতোরের মধ্যে নারী সংরক্ষণ নিয়েও বিরোধীদের সমালোচনা সামনে এসেছে। মোদী রাজনৈতিক দলগুলিকে মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে বিধানসভা ও সংসদে মহিলাদের ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ কার্যকর করার লক্ষ্যে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। বিরোধীদের বক্তব্য, ২০২৩ সালে মহিলা সংরক্ষণ বিল পাশ হলেও ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তা কার্যকর হয়নি।

সব মিলিয়ে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে ‘দিমাগি নকশাল’ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে মুখোমুখি শাসক ও বিরোধী শিবির। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য যেখানে নকশালপন্থী মতাদর্শের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা হিসেবে সামনে এসেছে, বিরোধীদের দাবি, সেই শব্দবন্ধের আড়ালে সরকারের সমালোচকদেরও একই তকমায় দাগানো হচ্ছে। ফলে ১৫ অগস্টের লালকেল্লার ভাষণের পর দেশের রাজনীতিতে ‘দিমাগি নকশাল’ এখন নতুন বিতর্কের কেন্দ্রে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন