নজরবন্দি ব্যুরো: ৩১ অগস্টের মধ্যে নতুন শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করা কার্যত অসম্ভব। তাই সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court of India) কাছে আরও সময় চেয়ে আবেদন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশন (WBSSC)। সূত্রের খবর, এ বার আগের মতো কয়েক মাস নয়, তুলনামূলক ভাবে ‘অনেকটা সময়’ চাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে কমিশন।
২০২৫ সালের এপ্রিলে ২০১৬ সালের গোটা নিয়োগ প্যানেল বাতিল করেছিল সুপ্রিম কোর্ট। প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি চলে যায়। এরপর যোগ্য প্রার্থীদের জন্য নতুন করে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দেয় শীর্ষ আদালত।
প্রথমে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করার জন্য ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিল। পরে সেই সময়সীমা বাড়িয়ে ৩১ অগস্ট ২০২৬ করা হয়। কিন্তু সেই সময়সীমা শেষ হতে আর বেশি দেরি নেই। তার মধ্যেও নিয়োগের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এখনও বাকি।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নতুন করে শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা নেয় এসএসসি। একাদশ-দ্বাদশ স্তরের ৩৩টি বিষয়ের মধ্যে এখনও পর্যন্ত ২১টি বিষয়ের কাউন্সেলিং শেষ হয়েছে। অনেক প্রার্থী সুপারিশপত্র পেলেও তাঁদের নিয়োগপত্র এখনও হাতে পৌঁছয়নি। কারও পুলিশি যাচাই শেষ হলেও নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়নি।
এর মধ্যেই নতুন করে ধাক্কা এসেছে নথি যাচাই ও কাউন্সেলিংয়ে। ৩৬৫ জন প্রার্থীর নথি যাচাইয়ের কর্মসূচি স্থগিত হয়েছে। পাশাপাশি ১৪ অগস্ট থেকে ১২টি বিষয়ের কাউন্সেলিং শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সেটিও আপাতত পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও একাদশ-দ্বাদশের শিক্ষক নিয়োগের নথি যাচাই স্থগিত হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।
মূল জটের একটি বড় কারণ হয়ে উঠেছে ওবিসি সংরক্ষণ। সংরক্ষণ সংক্রান্ত জটিলতার কারণে নিয়োগের বিভিন্ন ধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে সমস্যা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের ওবিসি শ্রেণিবিন্যাস ও সংরক্ষণ নিয়ে আইনি জটিলতা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট OBC শ্রেণিবিন্যাসের বিষয়টি আদালতের চলমান মামলার ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতেই আরও সময় চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। সূত্রের খবর, আবেদন করার জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্রও প্রস্তুত করা হয়েছে। খুব শীঘ্রই সুপ্রিম কোর্টে সেই আবেদন জমা পড়তে পারে।
এর আগে রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন এবং এসএসসি চেয়ারম্যান দুষ্মন্ত নারিয়ালা জানিয়েছিলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব না হলে শীর্ষ আদালতের কাছে সময় চাওয়া হতে পারে। এ বার সেই সিদ্ধান্তই কার্যত চূড়ান্ত হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
সময় বাড়লে একদিকে যেমন ২০১৬ সালের বাতিল প্যানেলের যোগ্য প্রার্থীদের একাংশ সাময়িক স্বস্তি পেতে পারেন, অন্যদিকে নতুন করে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের অনিশ্চয়তাও দীর্ঘায়িত হবে। কারণ, ২০২৫ সালের পরীক্ষায় অনেক প্রার্থী সুপারিশপত্র পেলেও এখনও নিয়োগপত্র পাননি।
বিশেষ করে ২০১৬ সালের প্যানেলের যে যোগ্য প্রার্থীরা ২০২৫-এর নতুন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি, তাঁদের জন্য ৩১ অগস্টের সময়সীমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময় বাড়লে তাঁরা অন্তত আরও কিছুটা সময় হাতে পাবেন। কিন্তু নতুন পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের নিয়োগও পিছিয়ে গেলে তাঁদের চাকরিতে যোগদানের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হবে।
বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডলের বক্তব্য, সময় বাড়লে সরকার নিয়োগ প্রক্রিয়াটি আরও সতর্ক ভাবে সম্পন্ন করার সুযোগ পাবে। তবে তাঁর আশঙ্কা, নতুন পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বয়স বেড়ে যাওয়াও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অন্যদিকে যোগ্য শিক্ষক শিক্ষিকা অধিকার মঞ্চের মেহবুব মণ্ডলের প্রশ্ন, ওবিসি সংরক্ষণের জটিলতায় ২০১৬ সালের যোগ্য শিক্ষকদের কেউ বাদ পড়লে তাঁদের জন্য রাজ্য কী ব্যবস্থা করবে?
ফলে এখন নজর একটাই—সুপ্রিম কোর্ট এসএসসির নতুন সময়ের আবেদন কতটা মেনে নেয়। ৩১ অগস্টের আগে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কার্যত নেই। কমিশনের আবেদনে আদালত সাড়া দিলে শিক্ষক নিয়োগের জট কিছুটা সময়ের জন্য কাটতে পারে, কিন্তু হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থীর অনিশ্চয়তা যে এখনই শেষ হচ্ছে না, তা স্পষ্ট।



