বীরভূমের রামপুরহাটে রাস্তার নামবদল ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক। দীর্ঘদিনের ‘নেতাজি সুভাষ রোড’ রাতারাতি হয়ে গেল ‘ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী রোড’। নতুন নামের ফলক উদ্বোধনে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক ধ্রুব সাহা। কিন্তু তৃণমূল পরিচালিত রামপুরহাট পুরসভার দাবি, রাস্তার নাম পরিবর্তনের কোনও অনুমোদনই দেওয়া হয়নি। ফলে নিয়ম মেনে নামবদল হয়েছে কি না, তা নিয়েই উঠছে বড় প্রশ্ন।
রামপুরহাট পুর এলাকার পাঁচমাথা মোড় থেকে ঝনঝনিয়া পুল পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার রাস্তা দীর্ঘদিন ধরে ‘নেতাজি সুভাষ রোড’ নামেই পরিচিত। সম্প্রতি ওই রাস্তার পাশে গেরুয়া রঙের নতুন একটি নামফলক বসানো হয়। সেখানে পুরনো নামের বদলে লেখা হয়েছে ‘ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী রোড’।
নতুন ফলক উদ্বোধনের সময় উপস্থিত ছিলেন রামপুরহাটের বিজেপি বিধায়ক ধ্রুব সাহা। ঘটনাস্থলে দেখা যায় রামপুরহাট পুরসভার চেয়ারম্যান সৌমেন ভকতকেও। যদিও পরে চেয়ারম্যান স্পষ্ট করে দেন, পুরসভার তরফে রাস্তার নাম পরিবর্তনের কোনও অনুমোদন দেওয়া হয়নি।
পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর নামে রাস্তার নামকরণের জন্য বিজেপির তরফে আবেদন জমা পড়েছিল। কিন্তু সেই আবেদন এখনও পুরবোর্ডের অনুমোদন পায়নি। নিয়ম অনুযায়ী, কোনও রাস্তার নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রথমে পুরবোর্ডে প্রস্তাব পাস করতে হয়। এরপর প্রয়োজন হয় রাজ্য প্রশাসনের অনুমোদনের।
পুর চেয়ারম্যানের বক্তব্য, সেই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই নতুন নামফলক বসানো হয়েছে। ফলে বিধায়ক একক ভাবে রাস্তার নাম পরিবর্তন করতে পারেন না। পুরসভার অনুমোদন ছাড়া কী ভাবে নতুন ফলক লাগানো হল, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে বিজেপি বিধায়ক ধ্রুব সাহার দাবি, পুরসভার নথিতে ওই রাস্তার নাম সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য তাঁরা পাননি। তাঁর বক্তব্য, পুর চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতেই নতুন নামকরণ করা হয়েছে। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর (Subhas Chandra Bose) প্রতি বিজেপির যথেষ্ট শ্রদ্ধা রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে নতুন নামফলক লাগলেও রাস্তার সর্বত্র এখনও পুরনো নামই বহাল। এলাকার বিভিন্ন দোকান, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড এবং সরকারি সমবায় সংস্থার বোর্ডে এখনও ‘নেতাজি সুভাষ রোড’ লেখা রয়েছে। ফলে সরকারি ভাবে রাস্তার নাম বদল হয়েছে, নাকি শুধুমাত্র একটি নতুন ফলক বসানো হয়েছে, তা নিয়েই জটিলতা তৈরি হয়েছে।
ঘটনার প্রতিবাদে সরব হয়েছে বাম ও কংগ্রেসও। সিপিএমের তরফে পুরসভা এবং মহকুমাশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, অবিলম্বে রাস্তার পুরনো নাম ফিরিয়ে দিতে হবে। রামপুরহাট শহরের বিভিন্ন জায়গায় নেতাজির ছবি দিয়ে পোস্টারও দেওয়া হয়েছে।
প্রদেশ কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক মিলটন রসিদও এই ঘটনায় বিধায়ককে নিশানা করেছেন। তাঁর দাবি, কোনও বিধায়কের একক ভাবে রাস্তার নাম পরিবর্তনের ক্ষমতা নেই। জাতীয় ব্যক্তিত্ব নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নামে থাকা রাস্তার নাম বদল করে অন্যায় ও বেআইনি কাজ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
বিরোধীদের অভিযোগের পাল্টা জবাব দিয়েছেন বিজেপি বিধায়ক। তাঁর বক্তব্য, নেতাজি তাঁদের হৃদয়ে রয়েছেন এবং তাঁকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করেন তাঁরা। সিপিএমের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়ে ধ্রুব সাহা বলেন, যারা নেতাজিকে জীবিত ও মৃত অবস্থায় অপমান করেছে, তাদের কাছ থেকে তাঁরা কোনও জ্ঞান নেবেন না।
এই বিতর্কের মধ্যেই জাতীয় রাজনীতিতেও নেতাজিকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতোর চলছে। বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ নগেন রায় ওরফে অনন্ত মহারাজের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জলপাইগুড়ির ফুলবাড়ির এক সভায় তিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতাজির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাঁকে ‘দেশদ্রোহী’ বলে মন্তব্য করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই মন্তব্যের পর বিজেপি নেতৃত্বের নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তৃণমূল, বাম ও কংগ্রেস। মঙ্গলবার শ্যামবাজারে নেতাজির মূর্তিতে শ্রদ্ধা জানিয়ে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) বিজেপিকে নিশানা করে অভিযোগ করেন, নেতাজিকে অসম্মান করা হচ্ছে।
ফলে রামপুরহাটের রাস্তার নামবদলের ঘটনাটি শুধু স্থানীয় পুরসভার অনুমোদন সংক্রান্ত বিতর্কে আটকে নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে নেতাজির ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার এবং বিজেপি-বিরোধী দলগুলির রাজনৈতিক সংঘাতও। এখন দেখার, পুরসভা শেষ পর্যন্ত নতুন নামফলক নিয়ে কী পদক্ষেপ করে এবং প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়া বসানো ফলকটি বহাল থাকে কি না।



