ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক যখন চরম উত্তেজনার মধ্যে, ঠিক সেই সময়েই দুই দেশের প্রতিনিধিদের একাধিক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের খবর নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সরকারি স্তরে কোনও পক্ষই বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত না করলেও আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা রয়টার্স (Reuters)-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত কয়েক মাসে নিরপেক্ষ দেশে ভারত ও পাকিস্তানের সাবেক কূটনীতিক, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্তাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। এই তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই কূটনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম বৈঠকটি হয়েছিল থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে (Bangkok) এবং দ্বিতীয় বৈঠক শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোতে (Colombo)। তবে এই বৈঠকগুলি ছিল অনানুষ্ঠানিক বা ‘ট্র্যাক-টু ডিপ্লোমেসি’-র অংশ, যেখানে সরকারি প্রতিনিধির পরিবর্তে বিশেষজ্ঞ ও প্রাক্তন কর্মকর্তারা অংশ নেন।
এই আবহে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে সিন্ধু জলচুক্তি (Indus Waters Treaty)। ২০২৫ সালে পহেলগাঁওয়ের জঙ্গি হামলার পর ভারত এই চুক্তি কার্যকর রাখা স্থগিত করে। এরপর থেকেই পাকিস্তান একাধিকবার জল সংকটের আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফ (Khawaja Asif) প্রকাশ্যে সতর্ক করে বলেন, সিন্ধুর জল দীর্ঘদিন আটকে রাখা হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
এদিকে পাকিস্তানের রাজনৈতিক মহলেও দেখা যাচ্ছে নতুন ধরনের বক্তব্য। পাকিস্তান পিপলস পার্টির (Pakistan Peoples Party) চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি (Bilawal Bhutto Zardari) সম্প্রতি দাবি করেন, সিন্ধু সভ্যতার ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার পাকিস্তানের সঙ্গেই যুক্ত। এই মন্তব্যকে অনেক বিশ্লেষক পাকিস্তানের কূটনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
একই সময়ে পাকিস্তানে মহেঞ্জোদাড়ো (Mohenjo-daro), মেহেরগড় (Mehrgarh), তক্ষশীলা (Taxila) এবং গান্ধার (Gandhara) সভ্যতাকে কেন্দ্র করে সরকারি উদ্যোগে একাধিক গবেষণা, তথ্যচিত্র ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি আয়োজন করা হচ্ছে। পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে নতুনভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে ইসলামাবাদ।
তবে এই ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে সিন্ধু জলচুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার কোনও প্রত্যক্ষ যোগ রয়েছে কি না, তার পক্ষে এখনও কোনও সরকারি প্রমাণ সামনে আসেনি। একইভাবে ভারত-পাকিস্তানের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকগুলিও কোনও নীতিগত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে কি না, তাও স্পষ্ট নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈরী সম্পর্কের মধ্যেও দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের একটি সীমিত কূটনৈতিক চ্যানেল সচল রাখা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক নয়। সীমান্তে উত্তেজনা বা সংঘাতের পরিস্থিতিতেও এই ধরনের ট্র্যাক-টু বৈঠক ভবিষ্যতের সম্ভাব্য আলোচনার ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
ফলে সিন্ধুর জল, পাকিস্তানের নতুন ঐতিহাসিক বয়ান এবং দুই দেশের অনানুষ্ঠানিক বৈঠক— এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে সামনে এলেও, এগুলির মধ্যে সরাসরি কারণ-সম্পর্ক রয়েছে বলে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এই ঘটনাগুলি যে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের নজর এখন আরও তীক্ষ্ণ।



