তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে রাজনৈতিক টানাপোড়েন যখন তুঙ্গে, তখন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চার্টার্ড বিমানে যাতায়াত নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। দিল্লি সফরে তাঁর প্রাইভেট জেট ব্যবহারকে কেন্দ্র করে এবার প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তুলছেন দলের বর্তমান ও বিদ্রোহী— দুই শিবিরের নেতারাই।
দলের একাংশের অভিযোগ, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সংকটের সময় যখন বহু নেতা-কর্মী আইনি লড়াই, গ্রেফতারি এবং সাংগঠনিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন, তখন চার্টার্ড বিমানে নিয়মিত সফর নেতাকর্মীদের মধ্যে ভুল বার্তা দিচ্ছে। বিষয়টি এখন তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
শুক্রবার লোকসভার স্পিকারের সঙ্গে বৈঠকের জন্য দিল্লি যান অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সফরেও তিনি চার্টার্ড বিমান ব্যবহার করেছেন বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়। এরপরই দলের নেতা কুণাল ঘোষ মন্তব্য করেন, যদি দলীয় তহবিলের অর্থে এই ধরনের বিমান ব্যবহার হয়ে থাকে, তবে তিনি তার সঙ্গে একমত নন।
যদিও অভিষেক এই সমালোচনার সরাসরি জবাব না দিয়ে বলেন, তাঁর যাতায়াতের মাধ্যম নিয়ে যারা প্রশ্ন তুলছেন, তারা যদি লিখিতভাবে পরামর্শ দেন, তাহলে তিনি সাধারণ যাত্রীদের মতোই ইকনমি ক্লাসে ভ্রমণ করতে প্রস্তুত। পাশাপাশি তিনি সহকর্মীদের বিরুদ্ধে পাল্টা মন্তব্য করতেও অনীহা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে বিদ্রোহী শিবিরের নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ও পরোক্ষে এই ইস্যুতে কটাক্ষ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক কর্মীরা যখন বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, তখন বিপুল অর্থ ব্যয় করে চার্টার্ড বিমানে যাতায়াত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। দলের কর্মীদের আর্থিক সংকট এবং আইনি লড়াইয়ের প্রসঙ্গও তিনি সামনে আনেন।
রাজনৈতিক মহলের মতে, বিষয়টি শুধুমাত্র যাতায়াতের পদ্ধতি নিয়ে নয়, বরং নেতৃত্বের জীবনযাপন এবং দলীয় কর্মীদের বাস্তব অবস্থার মধ্যে ব্যবধান নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। সাম্প্রতিক সময়ে দলের একাধিক নেতা ও সাংসদও নেতৃত্বের কাজের ধরন এবং জীবনযাত্রা নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অতীতের বিভিন্ন নির্বাচনী প্রচারে চার্টার্ড বিমান ও হেলিকপ্টার ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের ব্যয় হয়েছিল। সেই তথ্য সামনে এনে সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই ধরনের ব্যয় কতটা প্রয়োজনীয়।
বিমান চলাচল সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিজাত শ্রেণির চার্টার্ড জেটের ভাড়া সাধারণত ঘণ্টাপ্রতি কয়েক লক্ষ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। যাতায়াতের দূরত্ব, অপেক্ষার সময়, বিমানবন্দরের চার্জ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ যোগ হলে মোট ব্যয় আরও বৃদ্ধি পায়।
তবে অভিষেকের ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ব্যস্ততার কারণে সময় বাঁচাতেই চার্টার্ড বিমান ব্যবহার করা হয়। এতে একই দিনে একাধিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া সম্ভব হয় এবং রাজনৈতিক কাজের গতি বজায় থাকে।
সব মিলিয়ে, দলের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার আবহে চার্টার্ড বিমান বিতর্ক নতুন করে নেতৃত্ব বনাম কর্মী বাস্তবতার প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। আগামী দিনে এই বিতর্ক কতটা রাজনৈতিক প্রভাব ফেলবে, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।



