উত্তরবঙ্গকে ধর্ম, সংস্কৃতি ও পর্যটনের আন্তর্জাতিক মানচিত্রে তুলে ধরতে আরও এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। শিলিগুড়িতে গড়ে উঠতে চলেছে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ও উচ্চতম মহাকাল মন্দির। পঞ্জিকা দেখে শুভক্ষণ নির্ধারণ করে শুক্রবার এই মহাপ্রকল্পের শিলান্যাস করলেন মুখ্যমন্ত্রী Mamata Banerjee। শিলিগুড়ি শহরের কেন্দ্রস্থলে, মাটিগাড়া–লক্ষ্মী টাউনশিপ এলাকায় ১৭.৪১ একর জমি জুড়ে তৈরি হবে এই ‘মহাকাল মহাতীর্থ মন্দির’, যেখানে প্রতিদিন এক লক্ষ দর্শনার্থী সমাগমের পরিকল্পনা রয়েছে।
শিলান্যাস মঞ্চ থেকেই মুখ্যমন্ত্রী জানান, দিঘার জগন্নাথ ধাম ও নিউটাউনের দুর্গা অঙ্গনের পর এই মহাকাল মন্দির হবে বাংলার ধর্মীয়–সাংস্কৃতিক পরিকাঠামোর তৃতীয় মাইলফলক। তাঁর কথায়, “পশ্চিমবঙ্গকে এক নম্বর করব বলেছিলাম, করেই ছাড়ব।” এই মন্দির শুধু তীর্থস্থান নয়, বিশ্ব পর্যটনেরও বড় আকর্ষণ হয়ে উঠবে বলে আশাবাদী তিনি।


কী থাকছে মহাকাল মহাতীর্থ মন্দিরে
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিস্তারিত নকশা ও ভাবনা তুলে ধরেন—
-
বিশ্বের উচ্চতম মহাকাল মূর্তি: মোট উচ্চতা ২১৬ ফুট। এর মধ্যে ১০৮ ফুট ব্রোঞ্জের মহাকাল মূর্তি এবং ১০৮ ফুট উচ্চ পেডেস্টাল।
-
নন্দীগৃহ: ১০৮ ফুট পেডেস্টালের পূর্ব ও পশ্চিম দিকে থাকবে দু’টি নন্দীগৃহ।
-
১২ জ্যোতির্লিঙ্গ ভাবনা: মন্দির চত্বরের চারপাশে থাকবে ১২টি অভিষেক লিঙ্গ মন্দির, যেখানে ভারতের ১২ জ্যোতির্লিঙ্গের প্রতিমূর্তি স্থাপন করা হবে—এক জায়গায় ‘সারা ভারত দর্শন’।
-
দুটি প্রদক্ষিণ পথ: একসঙ্গে প্রায় ১০ হাজার ভক্তের সমাগম সম্ভব।
-
চার কোণে চার দেবতা:
-
দক্ষিণ-পশ্চিমে গণেশ
-
উত্তর-পশ্চিমে কার্তিক
-
উত্তর-পূর্বে শক্তি
-
দক্ষিণ-পূর্বে বিষ্ণুনারায়ণ
-
-
সভামণ্ডপ: দু’টি বিশাল সভামণ্ডপে একসঙ্গে ৬ হাজারের বেশি মানুষ বসতে পারবেন।
-
শিল্প ও সংস্কৃতি: মহাকালের কাহিনি ও মহিমা ফুটে উঠবে পাথরের শিল্পকর্ম ও ফ্রেস্কো পেন্টিংয়ে।
-
রুদ্রাক্ষ কুণ্ড ও অমৃত কুণ্ড: পবিত্র অভিষেকের জল সংগ্রহের ব্যবস্থা।
-
পরিকাঠামো: প্রসাদ বিতরণ কেন্দ্র, স্যুভেনির আর্কেড, ক্যাফেটেরিয়া, ডালা কমপ্লেক্স, পুরোহিতদের আবাসন।
শিলিগুড়িকে ‘গ্লোবাল ট্যুরিজ়ম হাব’ করার পরিকল্পনা
মুখ্যমন্ত্রী জানান, মন্দিরের পাশাপাশি শিলিগুড়িতে একটি আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টার গড়ে তোলার জন্য জমি চিহ্নিত হয়েছে। জমি দেবে রাজ্য সরকার, বেসরকারি সংস্থা নির্মাণ করবে। তাঁর কথায়, “এটা শুধু ধর্মের জায়গা নয়, বিজ়নেসেরও পবিত্র স্থান হবে। শিলিগুড়ি আর শুধু ট্রানজ়িট পয়েন্ট নয়।”
তিনি আরও বলেন, পাহাড়ের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য ও সমতলের সংস্কৃতির বন্ধন আরও দৃঢ় হবে। ধর্ম–তীর্থ, পর্যটন ও ব্যবসা—তিন ক্ষেত্রেই ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
পঞ্জিকা দেখে শিলান্যাস
শিলান্যাসের মুহূর্ত নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমার একটা টাইমিং ছিল। অমৃতকাল দেখে এসেছি। ৪টে ১৫ মিনিটেই শিলান্যাস করেছি। কেউ ভাববেন না, আমি পঞ্জিকা দেখি না।” এই কারণে আগের কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনকে ধন্যবাদ জানান।
মহাকাল মন্দির ট্রাস্টের সদস্য ও ধর্মীয় গুরুদের উপস্থিতিতে শিলান্যাস সম্পন্ন হয়। মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই বিশাল প্রকল্প শেষ হতে সময় লাগবে প্রায় আড়াই বছর।
পরিযায়ী শ্রমিক প্রসঙ্গেও বার্তা
এই মঞ্চ থেকেই বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের হেনস্থার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন মমতা। তাঁর বক্তব্য, “আজ বাংলা ভাষায় কথা বললেই আক্রমণ হচ্ছে। কারও জীবন নেওয়া ধর্ম নয়—জীবন দেওয়াই ধর্ম।”









