২০২৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটের আগে রাজ্যের গ্রাম পঞ্চায়েত ও পঞ্চায়েত সমিতির মানচিত্রে বড়সড় বদল আসতে চলেছে। জনসংখ্যা, আয়তন এবং প্রশাসনিক সুবিধার কথা মাথায় রেখে পঞ্চায়েত পুনর্বিন্যাসের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার। প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী, রাজ্যে গ্রাম পঞ্চায়েতের সংখ্যা ৩,৩৩৯ থেকে বাড়িয়ে অন্তত ৪,০০০ করার ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে পঞ্চায়েত সমিতির সংখ্যাও ৩৪৫ থেকে বাড়িয়ে প্রায় ৪০০ করার প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে।
রাজ্য সরকারের যুক্তি, বর্তমানে বহু পঞ্চায়েত সমিতির আওতায় অতিরিক্ত সংখ্যক গ্রাম পঞ্চায়েত রয়েছে। কোথাও ১৭-১৮টি গ্রাম পঞ্চায়েত মিলিয়ে কয়েক লক্ষ মানুষকে একটি পঞ্চায়েত সমিতির মাধ্যমে পরিষেবা দিতে হচ্ছে। আবার কোথাও মাত্র তিন-চারটি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়েই তৈরি হয়েছে পঞ্চায়েত সমিতি। ফলে প্রশাসনিক ভারসাম্য আনতেই এই পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ বলে জানা গিয়েছে।
রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষের বক্তব্য, উন্নয়নমূলক কাজ দ্রুত করতে গ্রাম পঞ্চায়েত এবং পঞ্চায়েত সমিতির কাঠামোয় ভারসাম্য আনা জরুরি। তাঁর দাবি, মুখ্যমন্ত্রীও প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছেন। খুব শিগগিরই বড় গ্রাম পঞ্চায়েত ও পঞ্চায়েত সমিতিগুলিকে চিহ্নিত করে সমীক্ষার কাজ শুরু করতে পারে পঞ্চায়েত দপ্তর।
রাজ্যে শেষ পঞ্চায়েত নির্বাচন হয়েছিল ২০২৩ সালের ৮ জুলাই। সেই হিসাব অনুযায়ী, ২০২৮ সালের জুন-জুলাই নাগাদ পরবর্তী পঞ্চায়েত নির্বাচন হওয়ার কথা। তার আগেই পুনর্বিন্যাসের যাবতীয় প্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। অর্থাৎ আগামী ভোটের আগেই নতুন পঞ্চায়েত কাঠামো কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে রাজ্যে ৩,৩৩৯টি গ্রাম পঞ্চায়েত এবং ৩৪৫টি পঞ্চায়েত সমিতি রয়েছে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, গ্রাম পঞ্চায়েতের সংখ্যা অন্তত চার হাজারে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি পঞ্চায়েত সমিতির সংখ্যা ৪০০ করার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। নতুন জেলা তৈরির পরিকল্পনা এবং প্রশাসনিক সীমানার পরিবর্তনের সঙ্গেও এই পুনর্গঠনকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা চলছে।
এরই মধ্যে জনগণনার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। প্রশাসনিক মহলের ধারণা, জনগণনা থেকে পাওয়া জনসংখ্যার তথ্য পঞ্চায়েত ও পঞ্চায়েত সমিতির সীমানা পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। ফলে শুধু প্রশাসনিক সুবিধা নয়, জনসংখ্যার ভারসাম্যও পুনর্বিন্যাসের অন্যতম মাপকাঠি হতে পারে।
পঞ্চায়েত দপ্তরের রিপোর্টে উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদ, মালদা এবং হুগলির একাধিক বড় পঞ্চায়েত সমিতির কথা উঠে এসেছে। এই এলাকাগুলির কয়েকটি পঞ্চায়েত সমিতির আওতায় ১৫ থেকে ১৭টি পর্যন্ত গ্রাম পঞ্চায়েত রয়েছে। প্রশাসনের নজরে থাকা বড় পঞ্চায়েত সমিতিগুলির মধ্যে রয়েছে হুগলির ধনেখালি এবং মালদার কালিয়াচক-৩।
ধনেখালি ও কালিয়াচক-৩—দুই পঞ্চায়েত সমিতির আওতায় বর্তমানে ১৮টি করে গ্রাম পঞ্চায়েত রয়েছে। বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী কালিয়াচক-৩ প্রশাসনিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। কাজের পরিধি কমিয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে এই ধরনের বড় পঞ্চায়েত সমিতিকে ভাগ করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
এ ছাড়াও পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশকুড়া-১ ও কোলাঘাট, দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডায়মন্ড হারবার-১, জয়নগর ও ক্যানিং-১ এবং উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুর ও চোপড়ার মতো পঞ্চায়েত সমিতিও প্রশাসনের নজরে রয়েছে। জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক বিস্তারের ভিত্তিতে এগুলির কোনওটিকে দু’টি বা তিনটি ভাগে ভাগ করা হতে পারে।
শুধু পঞ্চায়েত সমিতিই নয়, বড় আকারের একাধিক গ্রাম পঞ্চায়েতও পুনর্বিন্যাসের তালিকায় রয়েছে। বীরভূমের রামপুরহাট-২ ব্লকের মাড়গ্রাম গ্রাম পঞ্চায়েত তার মধ্যে অন্যতম। সর্বশেষ সেন্সাসের তথ্য অনুযায়ী, এই গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় ৭,৮১৪টি পরিবার রয়েছে এবং জনসংখ্যা ৩০ হাজারের বেশি। এত বড় জনসংখ্যার পঞ্চায়েতকে ভাগ করার বিষয়টিও প্রশাসনের বিবেচনায় রয়েছে।
অন্যদিকে, রাজ্যে এমন কয়েকটি ছোট পঞ্চায়েত সমিতিও রয়েছে, যেখানে মাত্র চার-পাঁচটি গ্রাম পঞ্চায়েত রয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ঠাকুরপুকুর-মহেশতলা, দক্ষিণ দিনাজপুরের বংশীহারি, উত্তর দিনাজপুরের হেমতাবাদ, কোচবিহারের সিতাই, পশ্চিম মেদিনীপুরের মোহনপুর এবং বাঁকুড়ার মেজিয়া পঞ্চায়েত সমিতি সেই তালিকায় রয়েছে।
ফলে আগামী দিনে কোথাও বড় পঞ্চায়েত সমিতি ভেঙে নতুন একাধিক ইউনিট তৈরি হতে পারে, আবার কোথাও ছোট কাঠামোকে কী ভাবে আরও কার্যকর করা যায়, তা নিয়েও পর্যালোচনা হবে। ২০২৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটের আগে এই পুনর্বিন্যাস সম্পূর্ণ হলে রাজ্যের গ্রামীণ প্রশাসনের কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে চূড়ান্ত সীমানা, সংখ্যা এবং কোন পঞ্চায়েত কোথায় ভাগ হবে—সেসব সিদ্ধান্ত সমীক্ষা ও প্রশাসনিক পর্যালোচনার পরই স্পষ্ট হবে।



