হড়পা বানে নেপাল জুড়ে শুধুই হাহাকার, মৃত ১৬২; নিখোঁজ শত শত, তালিকায় ১৩৩ ভারতীয়ও

নেপাল-চিন সীমান্তে ভয়াবহ হড়পা বানে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬২। শত শত নিখোঁজ, তাঁদের মধ্যে অন্তত ১৩৩ ভারতীয়। হিমবাহের ধস কী ভাবে তৈরি করল এই ভয়ঙ্কর জলস্রোত?

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

পাহাড়ি নদীতে আচমকা নেমে আসা প্রবল জলস্রোতে কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে নেপাল-চিন সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা। বুধবারের ভয়াবহ হড়পা বানে এখনও পর্যন্ত অন্তত ১৬২ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে নেপাল পুলিশ। শত শত মানুষ নিখোঁজ, তাঁদের মধ্যে অন্তত ১৩৩ জন ভারতীয় নাগরিক। কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রায় থাকা বহু ভারতীয়ের কোনও খোঁজ না মেলায় উদ্বেগ আরও বাড়ছে।

নেপালের রাসুয়া জেলার রাসুয়াগঢ়ী এবং তিমুরে এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হড়পা বানের প্রবল স্রোতে বাড়িঘর, সেতু, রাস্তা, যানবাহন ও বিভিন্ন পরিকাঠামো ভেসে গিয়েছে। বিপর্যয়ের পর থেকে নেপালি সেনা, পুলিশ এবং সশস্ত্র বাহিনী উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছে। বহু জায়গায় রাস্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে পড়েছে।

এই বিপর্যয়ের ভয়াবহতা আরও বেড়েছে কারণ কোনও বড় বৃষ্টির পূর্বাভাস ছাড়াই আচমকা জল ও পাথরের বিশাল স্রোত নেমে আসে। প্রাথমিক উপগ্রহ বিশ্লেষণ এবং নেপালের বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চিন-নেপাল সীমান্তের কাছে একটি বরফ-পাথরের ধস নদীর গতিপথ আটকে দেয়। পরে সেই বাধা ভেঙে বিপুল জল, বরফ, কাদা ও পাথরের স্রোত নেমে আসে।

প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্পকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে মনে করা হলেও পরে বিপর্যয়ের মূল কারণ হিসেবে হিমবাহ বা বরফ-পাথরের ধসের বিষয়টি সামনে এসেছে। নেপালের জাতীয় বিপর্যয় ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক মূল্যায়নে রাসুয়াগঢ়ী সীমান্ত থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে লেহন্দে নদীর উপরের অংশে এই ধরনের ধসের কথা বলা হয়েছে।

ধসের জেরে লেহন্দে নদীর স্বাভাবিক জলপ্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়। পরে সেই জমে থাকা জল ও ধ্বংসাবশেষ প্রবল গতিতে নীচের দিকে নেমে এসে ভোতে কোশী নদী ব্যবস্থায় ঢুকে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে নদীর জলস্রোত ভয়ঙ্কর রূপ নেয়। রাসুয়া থেকে নীচের দিকে বিস্তীর্ণ এলাকায় সেই স্রোতের প্রভাব পড়ে এবং একের পর এক জনপদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

রাসুয়াগঢ়ী সীমান্তবর্তী এলাকায় পরিস্থিতি ছিল বিশেষ ভয়াবহ। কাস্টমস চেকপোস্টের কাছে থাকা বহু গাড়ি ও ট্রাক স্রোতে ভেসে যায়। রাস্তা ও সেতু ধ্বংস হওয়ায় সীমান্তবর্তী এলাকার সঙ্গে যোগাযোগও কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রাথমিক হিসাবে অন্তত ১৯টি মোটরযোগ্য সেতু এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত বা ভেসে যাওয়ার খবর রয়েছে।

সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ রয়েছে নিখোঁজ ভারতীয়দের নিয়ে। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১৩৩ জন ভারতীয় নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার পুণ্যার্থীও রয়েছেন। দুর্যোগের কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে।

কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলপথ হওয়ায় এই বিপর্যয়ের প্রভাব পড়েছে পর্যটন ও তীর্থযাত্রাতেও। ভারত-সহ একাধিক দেশের পর্যটক ও পুণ্যার্থী ওই অঞ্চলে ছিলেন। ফলে নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকদের সংখ্যা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপ, নদীর তীর এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় তল্লাশি চালাচ্ছে।

বিপর্যয়ের জেরে নেপালের একাধিক জেলায় জাতীয় সড়ক ও স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, সেতু এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় অনেক এলাকায় ত্রাণ ও উদ্ধারকারী দল পৌঁছতেও সমস্যা হচ্ছে।

এখনও উদ্ধারকাজ শেষ হয়নি। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের নীচে এবং নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া মানুষদের খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছে নেপালের নিরাপত্তা বাহিনী। এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে নিখোঁজ ভারতীয়দের সন্ধান এবং আটকে থাকা পুণ্যার্থীদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনা এখনই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন