১৪ অগস্ট থেকে একাদশ-দ্বাদশের কাউন্সেলিং স্থগিত, ফের অনিশ্চয়তায় শিক্ষক নিয়োগ

ওবিসি সংরক্ষণ নিয়ে আইনি জটিলতার আশঙ্কায় একাদশ-দ্বাদশের শিক্ষক নিয়োগের কাউন্সেলিং স্থগিত করল SSC। ১৪ অগস্টের কাউন্সেলিং ও ১২ অগস্টের পুলিশি যাচাই আপাতত বন্ধ।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

একাদশ-দ্বাদশ স্তরে শিক্ষক নিয়োগের কাউন্সেলিং ঘিরে ফের বড় ধাক্কা চাকরিপ্রার্থীদের। ১৪ অগস্ট থেকে যে কাউন্সেলিং শুরু হওয়ার কথা ছিল, মঙ্গলবার রাতে নির্দেশিকা জারি করে তা আপাতত স্থগিত করেছে স্কুল সার্ভিস কমিশন (SSC)। শুধু কাউন্সেলিং নয়, সুপারিশপত্র পাওয়া প্রার্থীদের পুলিশি যাচাইকরণের প্রক্রিয়াও থমকে গিয়েছে। ফলে নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়লেন শিক্ষক পদপ্রার্থীরা।

আগের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ১৪ অগস্ট থেকে একাদশ-দ্বাদশ স্তরের ১২টি বিষয়ের প্রার্থীদের কাউন্সেলিং শুরু হওয়ার কথা ছিল। সেই প্রক্রিয়াই আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি, ইতিমধ্যে সুপারিশপত্র পাওয়া প্রার্থীদের নথি ও পুলিশি যাচাইয়ের কাজ ১২ অগস্ট থেকে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সেটিও স্থগিত করেছে মধ্যশিক্ষা পর্ষদ।

সূত্রের খবর, গোটা সিদ্ধান্তের নেপথ্যে রয়েছে ওবিসি সংরক্ষণ নিয়ে তৈরি হওয়া জটিলতা। নিয়োগের ক্ষেত্রে ওবিসি সংরক্ষণ ১৭ শতাংশ হবে, নাকি সংশোধিত ৭ শতাংশের হিসাব কার্যকর হবে—তা নিয়ে আইনি পরামর্শ নিতে চাইছে কমিশন। ভবিষ্যতে এই বিষয়টি নিয়ে মামলা হলে যাতে নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও জটিল না হয়, সেই কারণেই আগেভাগে আইনি দিকটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে কমিশন সূত্রে খবর।

এসএসসি চেয়ারম্যান দুষ্মন্ত নারিওয়ালা জানিয়েছেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখতেই আইনি পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে। অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ দফতরের তরফে যাচাই সংক্রান্ত নির্দেশিকা পাওয়ার পরেই কাউন্সেলিং স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

এই সিদ্ধান্তে স্বাভাবিক ভাবেই ক্ষোভ তৈরি হয়েছে শিক্ষক মহলের একাংশে। তাঁদের বক্তব্য, আদালতের নির্দেশ মেনে যখন নিয়োগ প্রক্রিয়া এগোচ্ছে, তখন আদালতের অনুমতি ছাড়া তা থামানো কতটা আইনসঙ্গত, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কেউ কেউ এটিকে আদালত অবমাননার সম্ভাবনার সঙ্গেও যুক্ত করছেন। যদিও বিষয়টি নিয়ে শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হতে হবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘ কয়েক বছরের জটিলতা। ২০১৬ সালের শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগের পর ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court of India) গোটা প্যানেল বাতিল করে দেয়। এর ফলে প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি চলে যায়।

পরে যোগ্য শিক্ষকদের সাময়িক ভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছিল শীর্ষ আদালত। প্রথমে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত এবং পরে ৩১ অগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত সবেতন কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে রাজ্যকে নতুন করে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।

সেই নির্দেশ মেনে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নতুন শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা নেয় স্কুল সার্ভিস কমিশন। ওই বছরই ফল প্রকাশ হয়। কিন্তু তার পরেও নিয়োগ প্রক্রিয়ার গতি নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। নবম-দশম স্তরে এখনও মূলত নথি যাচাইয়ের পর্যায়েই কাজ আটকে রয়েছে। অধিকাংশ বিষয়ের ইন্টারভিউও শেষ হয়নি।

তুলনায় একাদশ-দ্বাদশ স্তরে প্রক্রিয়া কিছুটা এগিয়েছিল। ৩৩টি বিষয়ের মধ্যে ২১টি বিষয়ের কাউন্সেলিং ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে। ওই প্রার্থীদের একাংশ সুপারিশপত্রও পেয়েছেন। কারও কারও পুলিশি যাচাই শেষ হলেও এখনও নিয়োগপত্র হাতে পাননি।

বুধবার ৩৬৫ জন প্রার্থীর নথি যাচাইয়ের কথা ছিল। সেই প্রক্রিয়াও এখন স্থগিত। পাশাপাশি ১২টি বিষয়ের কাউন্সেলিং ১৪ অগস্ট থেকে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও আপাতত তা হচ্ছে না। অর্থাৎ একাদশ-দ্বাদশ স্তরের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যে গতি তৈরি হয়েছিল, নতুন সিদ্ধান্তে ফের তাতে ব্রেক পড়ল।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে ৩১ অগস্টের সময়সীমা নিয়ে। ওই সময়ের পর একাধিক স্কুলে শিক্ষক ঘাটতি আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একদিকে পুরনো প্যানেলের যোগ্য শিক্ষকদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, অন্যদিকে নতুন নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীরাও এখনও কাজে যোগ দিতে পারেননি।

পরিস্থিতি জটিল হলে আদালতের দ্বারস্থ হয়ে আরও সময় চাওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন এবং এসএসসি চেয়ারম্যান দুষ্মন্ত নারিওয়ালা। কমিশনের তরফে চাকরিপ্রার্থীদের আশ্বস্ত করা হয়েছে, পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত ওয়েবসাইটে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে এবং দ্রুত জট কাটানোর চেষ্টা চলছে।

তবে কাউন্সেলিং স্থগিতের খবর ছড়াতেই নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাকরিহারা যোগ্য শিক্ষকদের একাংশ। তাঁদের অনেকেই প্রায় এক দশক পর ফের পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন। নতুন নিয়োগপত্র হাতে নিয়ে শিক্ষকতার পেশায় ফেরার আশায় ছিলেন তাঁরা।

যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকা অধিকার মঞ্চের মেহবুব মণ্ডলের দাবি, ২০১৬ সালের প্যানেলে থাকা যে শিক্ষকরা কোনও অনিয়মে যুক্ত ছিলেন না, তাঁদের যেন আর শাস্তি না পেতে হয়। তাঁর বক্তব্য, ভোটের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যোগ্য শিক্ষকদের সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা উচিত।

শিক্ষক সংগঠনগুলির একাংশের আশঙ্কা, ওবিসি সংরক্ষণ নিয়ে নতুন করে হিসাব বদল হলে ফের আদালতে মামলা হতে পারে। ৭ শতাংশ সংরক্ষণের ভিত্তিতে নতুন প্যানেল তৈরি করতে গিয়ে কোনও প্রার্থীর নাম বাদ পড়লে সেই সিদ্ধান্তও চ্যালেঞ্জ হতে পারে। সেক্ষেত্রে নিয়োগ আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল এবং মাধ্যমিক শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা সম্পাদক অনিমেষ হালদারও দ্রুত সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, আদালতের কাছে সময় চাওয়া সাময়িক সমাধান হতে পারে, কিন্তু যোগ্য শিক্ষক ও নতুন পরীক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।

ফলে ১৪ অগস্ট থেকে শুরু হতে চলা একাদশ-দ্বাদশের শিক্ষক নিয়োগের কাউন্সেলিং আপাতত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ফের প্রশ্নের মুখে নিয়োগের সময়সীমা। ওবিসি সংরক্ষণ নিয়ে আইনি জট কত দ্রুত কাটে এবং ৩১ অগস্টের আগে নিয়োগ প্রক্রিয়া কতটা এগোনো সম্ভব হয়, এখন সেদিকেই নজর চাকরিপ্রার্থীদের।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন