রাজ্য পুলিশের শীর্ষপদ নিয়ে ধোঁয়াশা আরও ঘনাল। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত ডিজি রাজীব কুমার ৩১ জানুয়ারি অবসর নিচ্ছেন, তার আগেই ২৮ জানুয়ারি তাঁর সরকারি বিদায় সংবর্ধনার দিনও ঠিক হয়ে গেছে। অথচ অবসরের ঠিক কয়েক দিনের মাথায় পরবর্তী ডিজি পদের জন্য কেন্দ্রকে পাঠানো আট জন আইপিএস অফিসারের তালিকায় রাজীবের নামও রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—রাজ্য কি রাজীবকেই ফের ডিরেক্টর জেনারেল পদে রাখতে চাইছে, নাকি এটি শুধুই প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা?
নবান্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, পরবর্তী স্থায়ী ডিজি নিয়োগের জন্য আট জন সিনিয়র আইপিএস অফিসারের নাম প্রস্তাব করে দিল্লিতে পাঠিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সেই তালিকায় রাজীব কুমারের পাশাপাশি রয়েছেন আইনি লড়াইয়ে থাকা আইপিএস রাজেশ কুমার-ও। গত বুধবার এই তালিকা ইউপিএসসি-র কাছে পাঠানো হয়েছে।


কীভাবে হয় ডিজি নিয়োগ? তিন জনের প্যানেল ফেরত পাঠাবে ইউপিএসসি
নিয়ম অনুযায়ী, রাজ্য সরকার ইউপিএসসি-র কাছে সিনিয়র আইপিএস অফিসারদের একটি প্রস্তাবিত তালিকা পাঠায়। এরপর ইউপিএসসি সেখান থেকে তিন জনের একটি প্যানেল তৈরি করে রাজ্যের কাছে পাঠায়। ওই তিন জনের মধ্য থেকেই রাজ্য সরকার পরবর্তী ডিজি নির্বাচন করে।
এবারের তালিকায় রাজীব ও রাজেশ ছাড়াও যাঁদের নাম রয়েছে তাঁরা হলেন—
-
রণবীর কুমার
-
দেবাশিস রায়
-
অনুজ শর্মা
-
জগমোহন
-
এন রমেশ বাবু
-
সিদ্ধিনাথ গুপ্ত
উল্লেখ্য, রাজ্য পুলিশের শেষ স্থায়ী ডিজি ছিলেন মনোজ মালবীয়। তিনি ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে অবসর নেন। তারপর থেকেই রাজ্য পুলিশের ডিজি পদে চলছে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা।
রাজীবের নাম তালিকায় কেন? প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতার যুক্তি
প্রশাসনিক সূত্রের একটি অংশ বলছে, রাজীবের নাম তালিকায় থাকা মানেই যে তাঁকেই আবার ডিজি করা হবে—তা নয়। ডিজি নিয়োগ সংক্রান্ত বিধি অনুযায়ী, মালবীয় অবসরের সময়ে যে আট জন সিনিয়র অফিসার উপযুক্ততার তালিকায় ছিলেন, তাঁদের নামই ইউপিএসসি-তে পাঠাতে হয়। রাজীবও সেই তালিকার মধ্যে পড়ায়, নাম পাঠানো কার্যত বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায়।
অর্থাৎ, রাজীবের নাম তালিকায় থাকা নিয়ে জল্পনা থাকলেও প্রশাসনিক মহলের দাবি—এটি প্রক্রিয়াগত বাধ্যবাধকতা।
কারা এগিয়ে? আলোচনায় তিনটি নাম
তবে সূত্রের খবর, পরবর্তী স্থায়ী ডিজি পদের জন্য তিনটি নাম বেশি করে আলোচনায় রয়েছে—
-
পীযুষ পাণ্ডে
-
রাজেশ কুমার
-
রণবীর কুমার
পীযুষ পাণ্ডে প্রাক্তন এসপিজি (SPG) এবং বর্তমানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। তবে এই তিন জনের মধ্য থেকেই যে চূড়ান্ত নাম বাছা হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই বলেই প্রশাসনিক সূত্র জানাচ্ছে।
আগেও তালিকা গিয়েছিল, কিন্তু ফিরেছিল—সময় নিয়ে ইউপিএসসি আপত্তি
এটা প্রথম নয়। স্থায়ী ডিজি নিয়োগের জন্য এর আগেও রাজ্য সরকার প্রস্তাবিত নামের তালিকা পাঠিয়েছিল। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া এগোয়নি আইনি এবং প্রশাসনিক জটিলতায়।
ইউপিএসসি জানিয়েছিল, পূর্ববর্তী ডিজি অবসর নেওয়ার অন্তত ৩ মাস আগে প্রস্তাবিত প্যানেল পাঠানো উচিত ছিল। অর্থাৎ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে মালবীয় অবসর নেওয়ার আগে সেপ্টেম্বরেই তালিকা পাঠানো দরকার ছিল। কিন্তু রাজ্য সেই তালিকা পাঠিয়েছিল ২৭ ডিসেম্বর, ফলে তা পরবর্তীতে ফেরত আসে।
‘বঞ্চিত’ অভিযোগে মামলা, ক্যাটের নির্দেশে নতুন তালিকা
এই পরিস্থিতির মধ্যে আইপিএস রাজেশ কুমার সেন্ট্রাল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রাইবুনাল (CAT)-এ মামলা করেন। ১৯৯০ ব্যাচের এই আইপিএস বর্তমানে রাজ্যের গণশিক্ষাপ্রসার ও গ্রন্থাগার পরিষেবা দফতরের মুখ্যসচিব। তাঁর অভিযোগ—ডিজি হওয়ার মতো যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
এই মামলার ভিত্তিতেই ট্রাইবুনাল নির্দেশ দেয়, ২৩ জানুয়ারির মধ্যে ইউপিএসসি-তে ডিজি পদের জন্য প্রস্তাবিত নামের তালিকা পুনরায় পাঠাতে হবে। সেই নির্দেশ মেনে রাজ্য সরকার বুধবারই আট জনের নাম পাঠিয়ে দিয়েছে।
২৮ জানুয়ারি ইউপিএসসি বৈঠক, ২৯-এ আসতে পারে তিন জনের প্যানেল
ট্রাইবুনালের নির্দেশ অনুসারে, আগামী ২৮ জানুয়ারি ইউপিএসসি-র এমপ্যানেলমেন্ট কমিটি এই তালিকা নিয়ে বৈঠকে বসবে। এরপর ২৯ জানুয়ারি তিন জনের প্যানেল তৈরি করে রাজ্যকে পাঠাতে পারে ইউপিএসসি।
CAT স্পষ্ট করে নির্দেশ দিয়েছে—যত দ্রুত সম্ভব ওই তিন জনের প্যানেল থেকে রাজ্যকে স্থায়ী ডিজি নিয়োগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।










