উত্তরপ্রদেশে ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) লোকসভা কেন্দ্র বারাণসীতে বড় ধাক্কা খেল বিজেপি (BJP)। উত্তরপ্রদেশ বিধান পরিষদের ১১টি আসনের নির্বাচনে ছ’টি আসন পেয়েছে বিজেপি, আর পাঁচটি গিয়েছে অখিলেশ যাদবের (Akhilesh Yadav) সমাজবাদী পার্টির (Samajwadi Party) ঝুলিতে। বারাণসীর শিক্ষক ও স্নাতক—দু’টি আসনেই নিজেদের দখল ধরে রেখেছে সমাজবাদী পার্টি। লখনউয়ের স্নাতক আসনও বিজেপির হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে তারা। বিধানসভা ভোটের কয়েক মাস আগে এই ফল উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিধান পরিষদের এই নির্বাচন রাজ্যের সব ভোটারের মতামতের সরাসরি প্রতিফলন নয়। শিক্ষক ও স্নাতক কেন্দ্রগুলিতে নির্দিষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন ভোটাররা ভোট দেন। তবু বারাণসী ও লখনউয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিজেপির পরাজয় রাজনৈতিক ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশে বিজেপির আসনসংখ্যা কমে যাওয়ার পর ২০২৭ সালের বিধানসভা ভোটের আগে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি ফের প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে গেরুয়া শিবির।
বারাণসীর স্নাতক কেন্দ্রের ফল নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলেছে টানটান লড়াই। ভোটগণনা শুরু হওয়ার প্রায় ৪৯ ঘণ্টা পরেও দুই দলের নেতা-কর্মীরা গণনাকেন্দ্রের সামনে অবস্থান করছিলেন। বিজেপি প্রার্থী কেদারনাথ সিং গণনায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে পুনর্গণনার দাবি জানান। অন্যদিকে, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব দলীয় কর্মীদের গণনাকেন্দ্র ছেড়ে না যাওয়ার নির্দেশ দেন। জয়ী প্রার্থীর শংসাপত্র হাতে পাওয়ার পরেই সেখান থেকে সরতে বলেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত বারাণসীর স্নাতক কেন্দ্রেও জয় পেয়েছেন সমাজবাদী পার্টির প্রার্থী আশুতোষ সিনহা। শিক্ষক কেন্দ্রটি ধরে রেখেছেন দলের লালবিহারী যাদব। শিক্ষক কেন্দ্রে বিজেপির প্রমোদকুমার মিশ্রকে ৫,০১৫ ভোটে হারিয়েছেন লালবিহারী। স্নাতক কেন্দ্রেও বিজেপির কেদারনাথ সিংকে পিছনে ফেলেছেন আশুতোষ। ফলে প্রধানমন্ত্রী মোদীর লোকসভা কেন্দ্রের দুই বিধান পরিষদ আসনেই বিজেপিকে হারতে হল।
বারাণসীর পাশাপাশি লখনউয়ের স্নাতক কেন্দ্রের ফলও বিজেপির কাছে ধাক্কা। সেখানে বিজেপির বিদায়ী বিধান পরিষদ সদস্য অবিনাশ সিংকে হারিয়ে জয়ী হয়েছেন সমাজবাদী পার্টির কান্তি সিং। এই আসনটি আগে বিজেপির দখলে ছিল। ফলে বিধান পরিষদের নির্বাচনে সমাজবাদী পার্টি শুধু নিজেদের পুরনো শক্ত ঘাঁটি ধরে রাখেনি, বিজেপির দখলে থাকা আসনও ছিনিয়ে নিয়েছে।
১১টি আসনের সামগ্রিক ফলে অবশ্য বিজেপি এগিয়ে। ছ’টি আসন পেয়েছে তারা, সমাজবাদী পার্টি পেয়েছে পাঁচটি। ২০২০ সালের নির্বাচনে বিজেপি ছ’টি এবং সমাজবাদী পার্টি তিনটি আসন জিতেছিল। অর্থাৎ বিজেপির আসনসংখ্যা অপরিবর্তিত থাকলেও সমাজবাদী পার্টি নিজেদের আসন বাড়িয়েছে। এই নির্বাচনে পাঁচটি স্নাতক ও ছ’টি শিক্ষক কেন্দ্রের ভোট হয়েছিল। ভোটগ্রহণ হয় ২৩ অক্টোবর, আর গণনা শুরু হয় ২৭ অক্টোবর।
নির্বাচনের আগে বিজেপি নেতৃত্বও প্রচারে সক্রিয় ছিল। ১৪ অক্টোবর শিক্ষক ও স্নাতক ভোটারদের একটি সভায় উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ (Yogi Adityanath) সমাজবাদী পার্টিকে শিক্ষাবিরোধী বলে আক্রমণ করেন এবং সরকারি চাকরির নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন। বিজেপির নেতারা আশা করেছিলেন, বিধান পরিষদের নির্বাচনে ভালো ফল করে বিধানসভা ভোটের আগে সংগঠনের শক্তি প্রদর্শন করা যাবে। কিন্তু বারাণসী ও লখনউয়ের ফল সেই প্রত্যাশায় ধাক্কা দিয়েছে।
উত্তরপ্রদেশের উপমুখ্যমন্ত্রী কেশব প্রসাদ মৌর্য (Keshav Prasad Maurya) জানিয়েছেন, দল আগের নির্বাচনের মতোই আসন পেয়েছে, তবে আরও বেশি আসন জয়ের প্রত্যাশা ছিল। কেন সেই লক্ষ্য পূরণ হল না, তা খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, অখিলেশ যাদব দলীয় কর্মীদের শান্তিপূর্ণ ভাবে জয়ের খবর প্রচার করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে এই ফলকে সরাসরি ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সম্ভাব্য ফল বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। শিক্ষক ও স্নাতক কেন্দ্রের ভোটারদের পরিসর সীমিত, এবং তাঁদের ভোটের প্রবণতা গোটা রাজ্যের জাতপাত, বয়স, গ্রামীণ-শহুরে বিভাজন ও অন্যান্য রাজনৈতিক সমীকরণকে সম্পূর্ণভাবে তুলে ধরে না। তা সত্ত্বেও, বিধানসভা ভোটের আগে বিজেপির শক্ত ঘাঁটিতে সমাজবাদী পার্টির এই সাফল্য অখিলেশ যাদবের দলের কাছে সাংগঠনিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।



