অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (Uniform Civil Code বা UCC) নিয়ে বড় ঘোষণা করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah)। তাঁর দাবি, ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগেই বিজেপি শাসিত ২১টি রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করা হবে। ইতিমধ্যেই উত্তরাখণ্ড ও গুজরাটে এই আইন কার্যকর হয়েছে। অসমেও UCC নিয়ে আইন পাশ হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। ফলে বাংলায় কবে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু হবে, তা নিয়ে ফের রাজনৈতিক জল্পনা শুরু হয়েছে।
অমিত শাহের বক্তব্য অনুযায়ী, একাধিক রাজ্যে ইতিমধ্যেই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করা হয়েছে। তাঁর আশা, ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগেই বিজেপি শাসিত ২১টি রাজ্যে UCC কার্যকর হবে। অর্থাৎ আগামী কয়েক বছরে আরও একাধিক রাজ্যে এই আইন কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে বিজেপির।
অভিন্ন দেওয়ানি বিধির মূল লক্ষ্য হল ধর্ম বা সম্প্রদায়ভেদে ব্যক্তিগত আইনের পরিবর্তে নির্দিষ্ট দেওয়ানি বিষয়ে একটি অভিন্ন আইনি কাঠামো তৈরি করা। বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, দত্তক-সহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত বিষয়ে একই নিয়ম কার্যকর করার কথা বলা হয় UCC-তে। তবে এর আওতায় কোন কোন বিষয় থাকবে এবং কোন সম্প্রদায় কীভাবে এর আওতায় আসবে, তা রাজ্যভেদে আইনের কাঠামোর উপর নির্ভর করতে পারে।
দেশে প্রথম উত্তরাখণ্ডে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করা হয়। এরপর গুজরাটেও UCC সংক্রান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অসমেও অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়া এগিয়েছে। মধ্যপ্রদেশে UCC-র খসড়া তৈরির জন্য কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিজেপি শাসিত আরও কয়েকটি রাজ্যেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।
তবে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক আগ্রহ পশ্চিমবঙ্গকে ঘিরে। বিজেপির পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলায় UCC কার্যকরের পক্ষে সওয়াল করা হলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অবস্থান আলাদা। ফলে অমিত শাহের ২১ রাজ্যের ঘোষণার পর বাংলায় কবে UCC চালু হতে পারে, সেই প্রশ্ন ফের সামনে এসেছে। এখনও পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করার কোনও চূড়ান্ত সরকারি ঘোষণা হয়নি।
অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর হলে ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইনের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। সমর্থকদের বক্তব্য, একই দেওয়ানি আইন কার্যকর হলে আইনের ক্ষেত্রে ধর্মভিত্তিক বৈষম্য কমবে এবং নাগরিকদের জন্য অভিন্ন নিয়ম তৈরি হবে। অন্যদিকে, বিরোধীদের একাংশের আশঙ্কা, দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়ের নিজস্ব রীতিনীতি এবং ব্যক্তিগত আইনের উপর এর প্রভাব পড়তে পারে।
UCC নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অমিত শাহ আদিবাসী সম্প্রদায়ের বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আদিবাসীদের কিছু নির্দিষ্ট প্রথা ও অধিকারকে এই আইনের আওতার বাইরে রাখার ব্যবস্থা থাকতে পারে। ফলে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।
এদিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) জন্মদিন এবং প্রশাসনিক পদে তাঁর ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘সেবা সংকল্প অভিযান’-এর কথাও ঘোষণা করেন অমিত শাহ। ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত এক মাস দেশজুড়ে এই কর্মসূচি চলবে বলে জানান তিনি। মুখ্যমন্ত্রী এবং পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদীর দীর্ঘ প্রশাসনিক জীবনের নানা দিক তুলে ধরাই এই প্রচারের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এই কর্মসূচির প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও সাফল্যের কথাও তুলে ধরেন অমিত শাহ। অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণ, সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ প্রত্যাহার এবং তিন তালাক প্রথা বাতিলের মতো বিষয়কে তিনি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন। একইসঙ্গে নকশালবাদ মোকাবিলার সাফল্যের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, দেশে অবৈধভাবে প্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে তাঁদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে, অমিত শাহের ২০২৯ সালের আগে ২১টি রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালুর দাবি UCC-কে ফের জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে এই আইন আদৌ কার্যকর হবে কি না, হলে কবে হবে এবং তার পরিধি কতটা হবে—আগামী দিনে সেই প্রশ্নগুলির উত্তরই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।



