হিন্দি নিয়ে বিতর্কের মাঝেই, হিন্দি ভাষা দিবসে নেতাজিকে সামনে রেখে শাহের বার্তা

হিন্দি ভাষা দিবসে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু-সহ অ-হিন্দিভাষী বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের হিন্দির প্রসারে অবদানের কথা তুলে ধরলেন অমিত শাহ। মাতৃভাষার গুরুত্বও স্পষ্ট করলেন তিনি।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

হিন্দি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে ভাষা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah)। ভারচুয়ালি বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি একদিকে হিন্দির প্রসারে অ-হিন্দিভাষী বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের অবদানের কথা তুলে ধরেন, অন্যদিকে মাতৃভাষার গুরুত্বও স্পষ্ট করেন। তাঁর বক্তব্যে বিশেষ ভাবে উঠে আসে স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর (Netaji Subhas Chandra Bose) প্রসঙ্গ। শাহের দাবি, বাঙালি হয়েও হিন্দি ভাষার প্রসারে নেতাজির ভূমিকা ছিল অনন্য।

হিন্দি ভাষা দিবস উপলক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অমিত শাহ বলেন, কোনও ভারতীয় ভাষাই অন্য ভাষার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। তাঁর কথায়, দেশের ভাষাগত বৈচিত্রই ভারতের অন্যতম শক্তি। প্রতিটি ভাষার সঙ্গে একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি জড়িয়ে রয়েছে। তাই ভাষাকে কেন্দ্র করে বিভাজনের পরিবর্তে একাধিক ভারতীয় ভাষা শেখার উপর জোর দেন তিনি।

দেশের যুবসমাজের উদ্দেশে শাহের পরামর্শ, মাতৃভাষাকে সবসময় অগ্রাধিকার দিতে হবে। তবে তার পাশাপাশি অন্যান্য ভাষা শেখার আগ্রহও তৈরি করা প্রয়োজন। নিজের মাতৃভাষায় কথা বলার ক্ষেত্রে কোনও ধরনের হীনমন্যতা থাকা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

শাহের বক্তব্য, ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়। নিজের ভাষার সঙ্গে মানুষের শিকড়, পরিবার, মাটি, ইতিহাস এবং সংস্কৃতির সম্পর্ক তৈরি হয়। তাই অন্য ভাষা শেখার অর্থ নিজের মাতৃভাষাকে পিছনে ফেলে দেওয়া নয়। বরং নিজের ভাষার প্রতি সম্মান রেখেই দেশের অন্যান্য ভাষা সম্পর্কে জ্ঞান বাড়ানোর বার্তা দিয়েছেন তিনি।

হিন্দির প্রসারে অ-হিন্দিভাষী ব্যক্তিত্বদের অবদানের উদাহরণ দিতে গিয়ে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী, মহাত্মা গান্ধী এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নাম উল্লেখ করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর দাবি, হিন্দির বিস্তারে শুধু হিন্দিভাষী মানুষই নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন।

স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর প্রসঙ্গে শাহ বলেন, তাঁর মাতৃভাষা ছিল গুজরাটি। কিন্তু হিন্দু ধর্মের প্রচারের জন্য তিনি ‘সত্যার্থ প্রকাশ’ হিন্দিতে রচনা করেছিলেন। মহাত্মা গান্ধীর প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান, ১৯১৮ সালে মাদ্রাজে হিন্দি প্রচার সভা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন গান্ধী।

এরপরই নেতাজির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন অমিত শাহ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাঙালি পরিবারের সন্তান নেতাজি বিদেশের মাটিতে আজাদ হিন্দ ফৌজ (Azad Hind Fauj) গড়ে তুলেছিলেন এবং সেখানে হিন্দি যোগাযোগের অন্যতম ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হত। নেতাজির সঙ্গে ‘জয় হিন্দ’ স্লোগানের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি।

স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় ভারতীয় ভাষাগুলির ভূমিকার কথাও নিজের বক্তব্যে উল্লেখ করেন শাহ। তাঁর দাবি, স্বাধীনতার পরেও দেশের বিভিন্ন ভাষা জাতি গঠন, প্রশাসন এবং উন্নয়নের বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। হিন্দি-সহ ভারতীয় ভাষাগুলি গণজাগরণ এবং জাতীয় ঐক্যকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

হিন্দি ভাষার সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, তাঁর মাতৃভাষা গুজরাটি হলেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সফরের সময় হিন্দিই তাঁর যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হয়ে ওঠে। তাঁর বক্তব্যে মূলত ভাষার বহুত্বের মধ্যেই পারস্পরিক যোগাযোগের সেতু তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে আসে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির (Narendra Modi) বক্তব্যের প্রসঙ্গও টানেন শাহ। তাঁর দাবি, লালকেল্লা থেকে প্রধানমন্ত্রী ঔপনিবেশিক মানসিকতার দাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সেই মুক্তির পথে ভাষারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সব মিলিয়ে হিন্দি ভাষা দিবসে অমিত শাহের বক্তব্যে একদিকে হিন্দির প্রসারের পক্ষে সওয়াল, অন্যদিকে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার বার্তা—দুই দিকই উঠে এসেছে। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর, নিজের ভাষাকে সম্মান করেই দেশের অন্যান্য ভাষা শেখার পরিসর বাড়াতে হবে। ভাষাগত বৈচিত্রকে বিরোধের কারণ না করে জাতীয় ঐক্যের শক্তি হিসেবে দেখার বার্তাই দিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন