দুবাইয়ে থাকা বীরভূমের পাথর ব্যবসায়ী মহম্মদ নাজিবুদ্দিন মণ্ডল ওরফে টুলু মণ্ডলকে দেশে ফেরার নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court of India)। ১৭ নভেম্বরের মধ্যে তাঁকে ভারতে ফিরতে হবে। পাশাপাশি, ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারির মতো কড়া পদক্ষেপ না করার আশ্বাস দিয়েছে রাজ্য পুলিশ। তবে এই সময়ের মধ্যে তদন্ত চলবে। পরবর্তী সুরক্ষার জন্য স্থানীয় আদালতের দ্বারস্থ হতে হবে টুলুকে।
বীরভূমে পাথর ও বালি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত টুলু মণ্ডলের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ সরকারি রাজস্ব ফাঁকি এবং বেআইনি কারবারের অভিযোগ রয়েছে। সেই মামলায় তদন্ত শুরু হওয়ার পর থেকেই তিনি দেশের বাইরে রয়েছেন বলে পুলিশের দাবি। বর্তমানে দুবাইয়ে পরিবারের সঙ্গে রয়েছেন তিনি। দেশে ফিরলে গ্রেফতারির আশঙ্কা থেকেই শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন টুলু।
কী হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টে?
টুলু মণ্ডলের মামলাটি শুনছিলেন বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত এবং বিচারপতি শীল নাগুর বেঞ্চ। টুলুর হয়ে আদালতে সওয়াল করেন প্রবীণ আইনজীবী মুকুল রোহতগি। তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে টুলু মণ্ডলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। রক্ষাকবচ পেলে তিনি দেশে ফিরতে প্রস্তুত।
টুলুর আইনজীবীর দাবি, তাঁর মক্কেল কোনও পলাতক অপরাধী নন। তিনি পরিবারের সঙ্গে দুবাইয়ে রয়েছেন এবং সেখানে বৈধ ব্যবসা করছেন। সওয়ালের সময় রোহতগি বলেন, “টুলু মণ্ডল দাউদ ইব্রাহিম নন।” তাঁর বক্তব্য, দেশের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা নিয়ে দুবাইয়ে বৈধ ব্যবসা করছেন টুলু।
এরপর রাজ্য পুলিশের বক্তব্য জানতে চান বিচারপতিরা। রাজ্যের হয়ে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা জানান, টুলু দেশে ফিরলে আপাতত তিন সপ্তাহ তাঁকে গ্রেফতার করা হবে না। তবে তদন্তের কাজ থেমে থাকবে না। এরপরই ১৭ নভেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার নির্দেশ এবং ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত গ্রেফতারি থেকে অন্তর্বর্তী সুরক্ষার বিষয়টি সামনে আসে।
বীরভূমের পাথর ও বালি কারবার ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই তদন্ত চলছে। পুলিশের অভিযোগ, ডুপ্লিকেট কার্বন রসিদ বা DCR সংক্রান্ত অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব সরকারের কোষাগারে জমা পড়েনি বলে তদন্তকারীদের দাবি।
পুলিশের অভিযোগ অনুযায়ী, এই কারবারের মাধ্যমে মোট রাজস্ব ক্ষতির অঙ্ক প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা হতে পারে। যদিও এই অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতে বিচারাধীন। টুলু মণ্ডলের বিরুদ্ধে তদন্তের অংশ হিসেবে চার্জশিটও জমা পড়েছে বলে জানা গিয়েছে।
গত জুলাই মাসে বীরভূমের মহম্মদবাজার এলাকায় টুলুর এক আত্মীয়ের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা ও সোনা উদ্ধার করে পুলিশ। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উদ্ধার হওয়া নগদের পরিমাণ প্রায় ২৮.৫ কোটি টাকা এবং সোনার পরিমাণ নিয়ে ভিন্ন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। রাজ্য সরকারের বক্তব্য ছিল, উদ্ধার হওয়া সম্পত্তির সঙ্গে টুলু মণ্ডলের যোগ রয়েছে।
এরপর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত আরও জোরদার হয়। টুলু দেশ ছেড়েছেন বলে পুলিশের দাবি। কলকাতা হাই কোর্টেও তাঁর আবেদন খারিজ হয়েছিল। ২২ সেপ্টেম্বর হাই কোর্ট তাঁর গ্রেফতারি পরোয়ানা ও পলাতক ঘোষণার বিরুদ্ধে করা আবেদন খারিজ করে দেয়। সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করেই সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন তিনি।
সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া অন্তর্বর্তী সুরক্ষা স্থায়ী নয়। ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত গ্রেফতারি থেকে রেহাই থাকলেও তদন্তের ক্ষেত্রে রাজ্য পুলিশের ক্ষমতা বহাল থাকবে। এই সময়ের মধ্যে দেশে ফিরে স্থানীয় আদালতে পরবর্তী রক্ষাকবচের আবেদন করতে হবে টুলু মণ্ডলকে।
অন্যদিকে, কেন্দ্রের তরফে আগের শুনানিতে জানানো হয়েছিল, দুবাইয়ের সঙ্গে ভারতের বন্দি প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত চুক্তি রয়েছে এবং সেই পথেও তাঁকে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। টুলুর আইনজীবী অবশ্য দাবি করেছিলেন, তিনি পরিবারের সঙ্গে দুবাইয়ে রয়েছেন এবং সেখানে তাঁর বৈধ ব্যবসা রয়েছে।
এখন নজর ১৭ নভেম্বরের দিকে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টুলু মণ্ডল দেশে ফেরেন কি না, আর দেশে ফেরার পর স্থানীয় আদালত তাঁকে কী ধরনের আইনি সুরক্ষা দেয়, তা নিয়েই পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করছে।



