অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সদ্য সমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনের পর সাফল্যের নিরিখে যদি কোনও একটা নাম সবচেয়ে বেশি চর্চিত হয়ে থাকে সেটা তিনিই। ডায়মণ্ড হারবার কেন্দ্র থেকে শুধুমাত্র অভিষেক রেকর্ড মার্জিনে জিতেছেন তাই নয়, এ রাজ্য থেকে তৃণমূল যে ২৯টি আসন পেয়েছে তার নেপথ্যে ছিল তাঁর নিজস্ব স্ট্র্যাটেজি। আর সেখানেই তিনি মাত দিয়েছেন বিরোধীদের।
আরও পড়ুন: দিশা দেখাতে পারলেন ক্যাপ্টেন? মীনাক্ষীর বুথে CPIM পেল সর্বসাকুল্যে ৪৬ ভোট!


অভিষেককে নিয়ে বিরোধীদের একটা লাগাতার প্রচার ছিল, বা এখনও হয়তো তাঁরা ভাঙা ক্যাসেটের মতো বাজিয়ে যাবেন, সেটা হল, তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা একজন নেতা, যার নাকি নিজস্ব কোনও গ্রহণযোগ্যতা নেই! কিন্তু, এই অভিযোগে কি আর ধোপে টিকবে? লোকসভার ফলাফল সম্পূর্ণ অন্য কথার প্রমাণ দিচ্ছে।

তৃণমূল সূত্রে খবর, এবারের লোকসভায় তাঁদের যে মূল ট্যাগলাইন ছিল অর্থাৎ ‘জনগণের গর্জন, বাংলা বিরোধীদের বিসর্জন’, বা সংক্ষেপে ‘জনগর্জন’, এটা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়েরই মস্তিষ্কপ্রসূত। শুধু তাই নয়, অভিষেকের ঘনিষ্ঠ মহলে কান পাতলে জানা যায়, এই লোকসভার আগে দৈনিক প্রায় ১২-১৬ ঘন্টা কাজ করেছেন তিনি। তাঁর নিজস্ব একটা টিম রয়েছে। সেখানে কাজ করেন অনেকেই। তাঁরাই প্রতিনয়ত অভিষেককে তথ্য তুলে ধরতেন।
সেই তথ্যের ভিত্তিতেই তৃণমূলের প্রচার কর্মসূচি স্থির করা হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিষেক গোটা রাজ্য চষে ফেলেছেন। তার একটা প্রভাব মিলেছে ভোটব্যাঙ্কে। তাছাড়া এবারের ব্রিগেডে র্যাম্প করে হাঁটা, প্রার্থীদের নাম বাছাই এবং ঘোষণার কায়দা সবই হয়েছে অভিষেকের মত অনুযায়ী।



আরও একটা তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, সেটা হল বহরমপুরে ৫ বারের সাংসদ অধীর রঞ্জন চৌধুরীকে হারানো। সেখানেও অভিষেকই চেয়েছিলেন ইউসুফ পাঠানকে টিকিট দিতে। তাঁর কাছে তথ্য ছিল, বহরমপুরে নিজের আধিপত্য আগের মতো কায়েম নেই অধীরের। কিন্তু, প্রার্থী জোরদার হতেই হত। আর তা করেই অধীরের গদি কেড়ে নিয়েছে তৃণমূল।
ফলে, রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা উত্তরণ হয়েছে। শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আলোয় তিনি আলোকিত হন, তা বলাটা সত্য হবে না। পারিবারিক সম্পর্ককে অস্বীকার করে এগোনো যে কোনও মানুষের কাছেই কিছুটা কঠিন। তাছাড়া তিনি সেই রাজনৈতিক আদর্শে অনুপ্রাণিত। ইডি-সিবিআই তলব করে তাঁকে অতিষ্ট করা হলেও ধৈর্য্য হারাননি তিনি। বরং বিগত কয়েক বছরে নিজের বাচনভঙ্গি থেকে শুরু করে বডি ল্যাঙ্গুয়েজে একটা বিশাল বিবর্তন এনেছেন তিনি নিজেই।
জনগর্জন নামকরণ থেকে বুথ ভিত্তিক স্ট্র্যাটেজি, অভিষেকের নেতৃত্বেই ব্যাপক সাফল্য, মানছেন সবাই

অভিষেকের ঘনিষ্ঠ মহল থেকে আরও জানা যায়, তিনি ভোটের আগে প্রতিনিয়ত ৪২ জন প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। তাঁদের মনোবল বৃদ্ধি, রণকৌশল ঠিক করে দেওয়া সবকিছুতেই বুদ্ধি দিতেন তিনি। আর শুধু প্রার্থীদের সঙ্গেই নয়, বুথ লেভেলের কর্মীদের জন্যও তাঁর দরজা ছিল সবসময় খোলা। অভিষেক নির্বাচনের আগে বারবার বলে গিয়েছেন, এবার তৃণমূলই বেশি আসন পাবে। আর হলও তাই।
সব মিলিয়ে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে রাজনৈতিক জীবনের একটা অন্য স্তরে নিয়ে যেতে চাইছেন তা স্পষ্ট। বলা ভালো, তাতে তিনি সফলও হলেন। এই নিয়ে তিনি বার সাংসদ নির্বাচিত হলেন। জিতলেন ৭ লক্ষ ১০ হাজার ৯৩০ ভোটে। এবারের বিষ্ণুপুরের বিজেপি সাংসদ সৌমিত্র খাঁ পর্যন্ত প্রকাশ্যে স্বীকার করে নিয়েছেন যে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় খুব ভালো স্ট্র্যাটেজি করেছেন। এখন আগামীদিনে অভিষেক কোন পথে এগোন এবং ২০২৬ বিধানসভায় তাঁর কী ভূমিকা থাকে তা দেখতেই উদগ্রীব রাজনৈতিক মহল।







