তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী এবং সাংগঠনিক খরচ নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দেওয়া দলের গত চার বছরের অডিট রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, বিমান ও হেলিকপ্টার ভাড়ার পিছনেই প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে দল। এই বিপুল অঙ্কের খরচ প্রকাশ্যে আসতেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর চর্চা।
দলের আর্থিক নথি অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিমান ও হেলিকপ্টার ব্যবহারের জন্য মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ ব্যয় নজিরবিহীন বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
অডিট রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে, ২০২২ সালে বিমান ভাড়ার জন্য ব্যয় হয়েছিল ৩৫ কোটিরও বেশি। ২০২৩ সালে সেই খরচ কমে প্রায় ১৩ কোটিতে নেমে এলেও ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় তা হঠাৎ করেই বেড়ে ৫৬ কোটির গণ্ডি পেরিয়ে যায়। ২০২৫ সালে বড় কোনও নির্বাচন না থাকলেও বিমান ভাড়ায় ব্যয় হয়েছে ৩৭ কোটিরও বেশি।
সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের খরচের হিসাব। তৃণমূলের জমা দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর নির্বাচনী প্রচারে মোট ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৮২ কোটি টাকা। তার মধ্যে শুধু বিমান ভাড়ার খরচই ছিল ৪৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট নির্বাচনী ব্যয়ের ৫৬ শতাংশেরও বেশি খরচ হয়েছে আকাশপথে যাতায়াতের জন্য।
দলীয় সূত্রের দাবি, এই বিমান ও হেলিকপ্টার ব্যবহারের বড় অংশই হয়েছিল দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সফরের জন্য। কারণ নির্বাচনের সময় ছাড়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাধারণত রাজ্য সরকারের ব্যবস্থাপনায় বিমান বা হেলিকপ্টার ব্যবহার করেন, যার খরচ দলীয় তহবিল থেকে বহন করা হয় না।
এই তথ্য সামনে আসার পর দলের অন্দরে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। নির্বাচনী ফল প্রকাশের আগে বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে খুব কম নেতা মুখ খুললেও, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অনেকে সরব হয়েছেন। বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ প্রকাশ্যেই জানিয়েছেন, দলীয় তহবিলের অর্থে প্রাইভেট জেট ব্যবহারের পক্ষে তিনি নন।
অন্যদিকে বিদ্রোহী শিবিরের নেতারাও এই ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, যখন তৃণমূলের বহু নেতা-কর্মী আইনি লড়াই বা সাংগঠনিক প্রয়োজনে আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন না, তখন এত বিপুল অঙ্কের বিমান খরচ কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
সমালোচকদের আরও দাবি, একজন সাংসদ হিসেবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যাত্রীবাহী বিমানে বিজনেস ক্লাসে ভ্রমণের সুযোগ পান। সেই পরিস্থিতিতে দলীয় তহবিল থেকে প্রাইভেট জেট ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
এদিকে শুক্রবার রাতে তৃণমূলের তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে লেনদেন স্থগিত হওয়ার খবরও সামনে এসেছে। পুলিশ সূত্রে দাবি, ওই অ্যাকাউন্টগুলিতে প্রায় ৪৪০ কোটি টাকা জমা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দলকে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের মুখে পড়তে হতে পারে বলে মনে করছেন আইনজীবীরা।
সব মিলিয়ে তৃণমূলের আর্থিক ব্যয়ের এই পরিসংখ্যান শুধু রাজনৈতিক বিতর্কই তৈরি করেনি, দলের ভবিষ্যৎ আর্থিক কৌশল নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বিশেষ করে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলীয় ব্যয় কাঠামোয় কোনও পরিবর্তন আসে কি না, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।



