মার্কিন শুল্কনীতির ধাক্কা এবার সরাসরি এসে পড়ল টাটা মোটরসের বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবসায়। জাগুয়ার অ্যান্ড ল্যান্ড রোভারের (JLR) বিক্রি কমায় আগামী দু’বছরে ব্রিটেনে প্রায় ৪,০০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের পথে হাঁটছে টাটা মোটরস। পাশাপাশি উৎপাদন কমিয়ে বছরে তিন লক্ষের বেশি গাড়ি না তৈরির পরিকল্পনাও করা হচ্ছে বলে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি।
ভারতীয় কর্মীদের ক্ষেত্রে আপাতত এর কোনও প্রভাব পড়ছে না। ছাঁটাইয়ের সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছেন মূলত ব্রিটেনে JLR-এর কারখানা ও সংশ্লিষ্ট কাজের সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা। ব্রিটেনের জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস-এর প্রতিবেদনে দাবি, কর্মী কমানোর পাশাপাশি ব্যয় প্রায় ১৭০ কোটি পাউন্ড কমাতে চাইছে সংস্থাটি। ভারতীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ২১,৭০০ কোটি টাকা।
JLR-এর কর্মী এবং শ্রমিক সংগঠনগুলির সূত্রে জানা গিয়েছে, ইতিমধ্যেই স্বেচ্ছাবসরের কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। উৎপাদন কমানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। সেই লক্ষ্যেই সংস্থার ‘ব্রেক-ইভেন পয়েন্ট’ বা আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য বজায় রাখার স্তর বছরে প্রায় তিন লক্ষ গাড়িতে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে দাবি।
শিল্পক্ষেত্রে ‘ব্রেক-ইভেন পয়েন্ট’ বলতে সেই উৎপাদন বা বিক্রির মাত্রাকে বোঝায়, যেখানে কোনও সংস্থার মোট আয় ও মোট খরচ সমান হয়ে যায়। অর্থাৎ ওই স্তরে সংস্থার না লাভ হয়, না ক্ষতি। উৎপাদন কমানোর সিদ্ধান্তের পিছনে বিক্রির উপর চাপকেই অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দ্য টাইমস-এর প্রতিবেদনে দাবি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump) শুল্কনীতির কারণে ইউরোপের বাজারে JLR-এর গাড়ির দাম বেড়েছে। তার প্রভাব পড়েছে বিক্রিতে। ফলে খরচ কমানো এবং উৎপাদন নিয়ন্ত্রণের মতো কঠিন সিদ্ধান্তের দিকে এগোতে হচ্ছে সংস্থাকে।
ব্রিটেনে JLR-এর দু’টি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন কেন্দ্র রয়েছে—মিডল্যান্ডস এবং মার্সিসাইড। সংস্থাটিতে বর্তমানে প্রায় ৩৪,০০০ কর্মী কাজ করেন। এর বাইরে JLR-এর যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যুক্ত প্রায় ১.২ লক্ষ কর্মীর কর্মসংস্থানও পরোক্ষ ভাবে এই ব্যবসার উপর নির্ভরশীল। ফলে ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু সংস্থার কর্মীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আমেরিকার বাজার JLR-এর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংস্থার মোট বিক্রির প্রায় ২৯ শতাংশই যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। বর্তমানে সেখানে JLR-এর গাড়ির উপর ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর রয়েছে। ফলে অন্যান্য গাড়ি প্রস্তুতকারক সংস্থার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় চাপ বাড়ছে। এরই মধ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে সংস্থার রাজস্ব প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বের গাড়ি শিল্পে কর্মী কমানোর প্রবণতাও সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। জার্মান গাড়ি নির্মাতা ফোক্সভাগেন (Volkswagen) বিপুল সংখ্যক কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা জানিয়েছে। এর আগে টাটা গোষ্ঠীর তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা টিসিএস (TCS)-ও ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে উল্লেখযোগ্য কর্মী হ্রাসের পথে হেঁটেছিল।
ফলে একের পর এক ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে কর্মী কমানোর খবরের মধ্যেই এবার টাটা মোটরসের JLR-কে ঘিরে তৈরি হল নতুন উদ্বেগ। মার্কিন শুল্ক, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার চাপ এবং উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ—এই তিন চ্যালেঞ্জ সামলে বিলাসবহুল গাড়ির ব্যবসাকে কতটা দ্রুত ঘুরিয়ে দাঁড় করানো যায়, এখন সেটাই টাটা মোটরসের সামনে বড় পরীক্ষা।



