পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের উপভোক্তাদের তথ্য যাচাই করতে গিয়ে বিপুল সংখ্যক নামের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রাজ্য সরকারের দাবি, বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য যাচাইয়ের সময় ৩০ লক্ষেরও বেশি উপভোক্তার কোনও খোঁজ মিলছে না। এই উপভোক্তাদের পিছনে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করছেন প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকদের একাংশ। যদিও এই বিপুল অঙ্কের ব্যয় এবং ভুয়ো উপভোক্তার সংখ্যা নিয়ে এখনও বিস্তারিত সরকারি হিসাব প্রকাশ্যে আসেনি।
নতুন সরকারের তরফে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের উপভোক্তাদের কেন্দ্রীয় সরকারের আয়ুষ্মান ভারত (Ayushman Bharat) এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিমা যোজনার আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সেই কাজের জন্য পুরনো উপভোক্তাদের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। আর সেই যাচাই পর্বেই একাধিক অসঙ্গতি সামনে আসছে বলে নবান্ন (Nabanna) সূত্রে খবর।
স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের কার্ড থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের খুঁজে না পাওয়ার ঘটনা প্রশাসনের কাছে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে আধিকারিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, কারও ঠিকানায় গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি মানেই তিনি ভুয়ো উপভোক্তা, এমন সিদ্ধান্ত এখনই নেওয়া হচ্ছে না। তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের পরেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, এই সমস্যা শুধু স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ নয়। কৃষক বন্ধু এবং খাদ্যসাথী প্রকল্পের উপভোক্তা তালিকাতেও বিপুল সংখ্যক নামের হদিশ পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রকল্পের তথ্য যাচাই করতে গিয়ে প্রতিটি প্রকল্পেই প্রায় ২০ থেকে ৩০ লক্ষ উপভোক্তার সন্ধান না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন এক শীর্ষ আধিকারিক।
স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের ক্ষেত্রে ২০১৭ সাল থেকে রাজ্যের কোষাগার থেকে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে বলে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী জানা যাচ্ছে। এই প্রকল্পে প্রায় ২ কোটি ৪৫ লক্ষ পরিবার নথিভুক্ত ছিল। উপভোক্তা পিছু পরিবারের জন্য সর্বোচ্চ ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ক্যাশলেস চিকিৎসার সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে তালিকায় থাকা নামগুলির সত্যতা যাচাই করা রাজ্যের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২৫ হাজার কোটি টাকার হিসাব নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। প্রশাসনের একাংশের অনুমান, বিভিন্ন প্রকল্পে সন্দেহজনক বা খুঁজে না পাওয়া উপভোক্তাদের বাদ দিয়ে তথ্য সংশোধন করা গেলে রাজ্যের ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় হতে পারে। অর্থাৎ এই অঙ্ককে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে ইতিমধ্যেই প্রমাণিত দুর্নীতি বা সরাসরি আর্থিক তছরুপের পরিমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রকৃত আর্থিক অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নির্ভর করবে বিস্তারিত অডিট ও তদন্তের উপর।
এই পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলিকে উপভোক্তাদের তথ্য পুনরায় যাচাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে খবর। কোথায় তথ্যের ভুল রয়েছে, কোথায় একই ব্যক্তির নামে একাধিক নথি রয়েছে এবং কোথায় বাস্তবে উপভোক্তার অস্তিত্বই মিলছে না, তা আলাদা করে চিহ্নিত করার কাজ চলছে।
সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এই যাচাই প্রক্রিয়ার গুরুত্ব যথেষ্ট। কারণ, প্রকৃত উপভোক্তাদের নাম যাতে কোনওভাবেই বাদ না যায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা যেন শুধুমাত্র যোগ্য ব্যক্তিদের কাছেই পৌঁছয়, সেই ব্যবস্থাও করতে চাইছে প্রশাসন। যাচাইয়ের পরে কতগুলি নাম বাদ পড়ে এবং কত টাকার সাশ্রয় সম্ভব হয়, সেটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।



