পশ্চিমবঙ্গে রাস্তা ও এলাকার নামকরণে ‘ভারতীয় ইতিহাস’ ফিরিয়ে আনার পক্ষে সওয়াল করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। স্বস্তিকা পত্রিকার শারদ সংখ্যা প্রকাশের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি জানান, শুধু সরকার বা মুখের পরিবর্তন নয়, ব্যবস্থারও পরিবর্তন চান মানুষ। সেই পরিবর্তনের অংশ হিসেবেই রাস্তার নামকরণ থেকে শিক্ষা ব্যবস্থা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের কথা বলেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, বড় প্রত্যাশা নিয়েই মানুষ তাঁদের ক্ষমতায় এনেছেন। ফলে সরকারের প্রতিটি স্তরের কাজের উপর নজর রাখা প্রয়োজন। পশ্চিমবঙ্গের ‘নবনির্মাণে’ সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে রাষ্ট্রবাদ ও জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রেও সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন শুভেন্দু।
রাস্তার নাম বদলের প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এলাকার নামকরণ এবং রাস্তার নামকরণের ক্ষেত্রেও ভারতীয় ইতিহাসকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তাঁর প্রশ্ন, মোঘল, পাঠান বা ইংরেজ শাসকদের মধ্যে যাঁদের তিনি ‘অত্যাচারী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, তাঁদের নামে এখনও রাস্তা থাকবে কেন?
এর পরেই লেনিন, কার্ল মার্কস এবং হো চি মিনের নাম উল্লেখ করেন তিনি। তাঁদের পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের ক্ষেত্রে কী অবদান রয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত মিলেছে, এমন একাধিক রাস্তার নাম ভবিষ্যতে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
এই কাজের জন্য ইতিমধ্যেই একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও জানান শুভেন্দু। ফলে রাজ্যে রাস্তা ও এলাকার নামকরণ নিয়ে আগামী দিনে নতুন করে প্রশাসনিক উদ্যোগ দেখা যেতে পারে।
শুধু রাস্তার নাম নয়, স্কুলের পাঠ্যক্রম নিয়েও বক্তব্য রাখেন মুখ্যমন্ত্রী। সিলেবাস কমিটির প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানান, মাতঙ্গিনী হাজরা এবং ক্ষুদিরাম বসুর মতো স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ইতিহাস আরও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে।
পাশাপাশি বাংলার বিভিন্ন তীর্থক্ষেত্রের ইতিহাস এবং পশ্চিমবঙ্গ গঠনের ইতিহাসও পাঠ্যক্রমে জায়গা পাবে বলে জানান তিনি। সরকারের পোষিত লাইব্রেরিগুলিতেও বাংলার মনীষী ও সংগ্রামীদের সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য থাকা উচিত বলে মন্তব্য করেন মুখ্যমন্ত্রী।
বাঙালি সংস্কৃতি ও সনাতনী সংস্কৃতির বিষয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে শুভেন্দু বলেন, এগুলি সম্পর্কে তরুণ প্রজন্মকে সচেতন করা প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য, এই জায়গায় সমাজের সবাইকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। সরকার তার ক্ষমতার মধ্যে থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করবে বলেও জানান তিনি।
এদিন বাগেশ্বর বাবুর পক্ষেও ফের বক্তব্য রাখতে দেখা যায় মুখ্যমন্ত্রীকে। বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি সংবিধান এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, আম্বেদকরের দেশে প্রত্যেকের কথা বলার অধিকার রয়েছে। তবে কোনও বক্তব্য কতটা গ্রহণ করা হবে, সেটি আলাদা বিষয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শুভেন্দুর বক্তব্যে এদিন বারবার উঠে আসে রাষ্ট্রবাদ, জাতীয়তাবাদ ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রসঙ্গ। তাঁর দাবি, উন্নয়ন এবং সংবিধান রক্ষার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দেশ ও জাতীয় পরিচয় সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির কাজও সরকার চালিয়ে যাবে।
পুজোকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে রূপান্তরের চেষ্টা এবং আরএসএসের মতো সংগঠনকে ‘জঙ্গি’ বলা নিয়ে যারা সমালোচনা করেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও সতর্ক থাকার বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। সব মিলিয়ে তাঁর বক্তব্যে প্রশাসনিক সংস্কারের পাশাপাশি শিক্ষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং রাস্তার নামকরণে পরিবর্তনের একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে।



