পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) ঘিরে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশকে কমিশনের কাজে “বাধা” নয়, বরং “শাপে বর” বলেই দেখছেন নির্বাচন কমিশনের একাংশ আধিকারিক। তাঁদের দাবি, আদালতের নির্দেশে এসআইআর প্রক্রিয়া থমকে যায়নি—উল্টে বেশ কিছু ক্ষেত্রে কমিশনের কাজ আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে এগোনোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কমিশনের এক আধিকারিকের বক্তব্য, “নির্বাচন কমিশনের মূল কাজে সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করেনি। আদালত একবারও বলেনি শুনানি করা যাবে না। কমিশনের চিহ্নিত ভোটারদের শুনানিতে অংশ নিতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে শুনানির জন্য অতিরিক্ত সময় পাওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে।”
১ কোটি ২৬ লক্ষ ভোটারকে নোটিস, শুনানি শেষ করতে সময়ের টানাটানি
কমিশন সূত্রে জানা যাচ্ছে, রাজ্যে ‘আনম্যাপড’ (unmapped) এবং তথ্যগত অসঙ্গতি বা ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’ থাকা প্রায় ১ কোটি ২৬ লক্ষ ভোটারকে শুনানির জন্য নোটিস পাঠানো হয়েছে। গত ২৭ ডিসেম্বর থেকে শুনানি শুরু হলেও এক মাস হতে চলল, এখনও পর্যন্ত মাত্র ৪০ শতাংশ ভোটারের শুনানি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ৬০ শতাংশ ভোটারের শুনানি এখনও বাকি।
পূর্বঘোষিত সূচি অনুযায়ী ৭ ফেব্রুয়ারি ছিল শুনানির শেষ দিন। কিন্তু এত বিপুল সংখ্যক ভোটারের শুনানি নিতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশাসনিক স্তরে চাপ বাড়ছিল। এই পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে অতিরিক্ত সময় পাওয়া যাবে বলেই মনে করছেন কমিশনের আধিকারিকদের একাংশ।
তালিকা প্রকাশের নির্দেশে বাড়তি ১০ দিন—কমিশনের মতে “সুবিধাই বেশি”
এতদিন তথ্যগত অসঙ্গতি থাকা ভোটারদের একটি কেন্দ্রীয় তালিকা ধরে শুনানিতে ডাকা হচ্ছিল। সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, ওই তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে এবং পঞ্চায়েত ভবন, ব্লক অফিস, পুরসভার ওয়ার্ড অফিসে তা টাঙাতে হবে।
একই সঙ্গে আদালত জানিয়েছে, তালিকা প্রকাশের দিন থেকে অতিরিক্ত ১০ দিন সময় দিতে হবে—বিশেষত যাঁরা এখনও দাবি, নথি বা আপত্তি জমা দেননি, তাঁদের জন্য।
কমিশনের অন্দরে মত, এতে করে পূর্ব নির্ধারিত সময়সীমার তুলনায় অন্তত আরও ১০ দিন বেশি সময় পাওয়া যেতে পারে, ফলে বাকি শুনানির চাপ সামলানো তুলনায় সহজ হবে।
ইআরও-দের সুবিধা, শুনানির গতি বাড়তে পারে
কমিশনের এক আধিকারিক দাবি করেছেন, তালিকা প্রকাশের বিষয়ে প্রস্তাব আগে থেকেই দেওয়া হয়েছিল—বিশেষ করে মৃত, স্থানান্তরিত, ‘নো-ম্যাপিং’ এবং তথ্যগত অসঙ্গতি থাকা ভোটারদের তালিকা প্রকাশ হলে কাজ সহজ হবে।
তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, তালিকা প্রকাশ হলে ইআরও (Electoral Registration Officer)-রা আগে থেকে পরিকল্পনা করে শুনানির প্রস্তুতি নিতে পারবেন। পাশাপাশি প্রতিদিন শুনানির সংখ্যাও বাড়তে পারে, কারণ নোটিস পাওয়া ভোটারদের একাংশ তালিকা প্রকাশের পর দ্রুত নথি জমা দিতে এগোতে পারেন।
পর্যাপ্ত কর্মী ও নিরাপত্তা মোতায়েনেও জোর সুপ্রিম কোর্টের
এসআইআর প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে চালাতে নির্বাচন কমিশন ও রাজ্যকে পর্যাপ্ত কর্মী নিয়োগ করার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। একই সঙ্গে আদালতের নির্দেশ, কর্মী ও নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন নিয়ে কমিশন এবং রাজ্যের জারি করা নির্দেশ প্রত্যেক জেলাশাসককে যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা যাতে বিঘ্নিত না হয়, সেদিকে নজর রাখার দায়িত্বও আদালত রেখেছে রাজ্যের ডিজি, প্রতিটি জেলার পুলিশ সুপার এবং জেলাশাসকের উপর।
কমিশনের এক আধিকারিকের দাবি, এতদিন রাজ্যের কাছে ডেটা এন্ট্রি অপারেটর চাওয়া হলেও তা পর্যাপ্ত পাওয়া যাচ্ছিল না। সুপ্রিম কোর্টের কড়া নির্দেশের পরে সেই ঘাটতি মেটার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি শুনানিকেন্দ্র ঘিরে যে উত্তেজনা বা গোলমালের অভিযোগ উঠেছে, ভবিষ্যতে তা ঠেকাতে পুলিশ আরও সক্রিয় হবে বলেই আশা করছেন তাঁরা।
কিছু নির্দেশে অস্বস্তি—প্রতিনিধি শুনানিতে থাকতে পারবেন
তবে সব ক্ষেত্রেই কমিশনের জন্য নির্দেশ “সুবিধাজনক” হয়নি বলেও রাজনৈতিক মহল মনে করছে। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, কোনও ভোটারের অনুমোদিত প্রতিনিধি শুনানিতে যোগ দিতে পারবেন। এমনকি সেই প্রতিনিধি সংশ্লিষ্ট এলাকার বুথ লেভেল এজেন্ট (BLA)-ও হতে পারেন।
এই নির্দেশে কমিশনের অন্দরে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে ধারণা, কারণ দীর্ঘদিন ধরেই তৃণমূল এই দাবিটি তুলে আসছিল। আদালতের নির্দেশকে তৃণমূল ইতিমধ্যেই নিজেদের ‘জয়’ বলেই ব্যাখ্যা করছে।
মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড নিয়েও নির্দেশ বদলাল ছবি
শুনানির নথি হিসেবে মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড গ্রহণযোগ্য কি না—এই প্রশ্নেও কমিশনের আগের অবস্থানের সঙ্গে আদালতের নির্দেশে পার্থক্য এসেছে। আগে কমিশন জানিয়েছিল, মাধ্যমিক পাশের শংসাপত্র লাগবে, অ্যাডমিট কার্ড যথেষ্ট নয়। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, যেখানে জন্মতারিখ উল্লেখ থাকে এমন মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড শুনানির সময় বিকল্প নথি হিসাবে জমা দেওয়া যেতে পারে।






