ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে অস্বচ্ছতা আর গোপনীয়তার অভিযোগে যখন রাজ্য-রাজনীতিতে প্রবল বিতর্ক, ঠিক তখনই নির্বাচন কমিশনকে একগুচ্ছ কড়া নির্দেশ দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া (SIR) চলাকালীন ‘তথ্যগত অসঙ্গতি’ বা লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি-র কারণে যাঁদের শুনানিতে ডাকা হচ্ছে, তাঁদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ্যে টাঙাতে হবে—সাফ জানাল সুপ্রিম কোর্ট। শুধু তাই নয়, ভোটারদের কাছ থেকে কোনও নথি জমা নিলে লিখিত রসিদ দেওয়াও বাধ্যতামূলক বলে স্পষ্ট করে দিল আদালত।
সোমবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হয়। তৃণমূল কংগ্রেসের করা মামলায় আদালত জানায়, তথ্যগত অসঙ্গতির তালিকা রাজ্যের সমস্ত গ্রাম পঞ্চায়েত দফতর, ব্লক অফিস ও ওয়ার্ড অফিসে প্রকাশ্যে টাঙাতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি ব্লক অফিসে আলাদা কাউন্টার খুলে ভোটারদের নথি জমা এবং আপত্তি জানানোর সুযোগ দিতে হবে নির্বাচন কমিশনকে।
কমিশন সূত্রে আগে জানানো হয়েছিল, তথ্যগত অসঙ্গতির কারণে প্রথমে প্রায় ১.৩৬ কোটি ভোটারকে চিহ্নিত করা হয়। পরে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৯৪ লক্ষে। এই তালিকা ধরেই ভোটারদের শুনানির নোটিস পাঠানো হচ্ছিল। কিন্তু কোন যুক্তিতে এত সংখ্যক ভোটারকে তলব করা হচ্ছে, সেই প্রশ্নে শুরু থেকেই সরব ছিল তৃণমূল-সহ একাধিক বিরোধী দল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন, তথ্যগত অসঙ্গতির তালিকা জনসমক্ষে আনতে হবে।
সেই দাবি মান্যতা পেয়েছে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে। আদালত আরও বলেছে, শুনানিকেন্দ্রে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের—বিশেষ করে বুথ লেভেল এজেন্টদের (BLA)—উপস্থিত থাকার অনুমতি দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে তৃণমূলের তোলা আপত্তি আদালত মেনে নিয়েছে।
নথি গ্রহণের ক্ষেত্রেও কড়া নিয়ম বেঁধে দিয়েছে শীর্ষ আদালত। কোনও ভোটারের কাছ থেকে কাগজপত্র জমা নেওয়া হলে, সংশ্লিষ্ট দফতরকে লিখিত ভাবে প্রাপ্তিস্বীকার বা রসিদ দিতে হবে। কোনও ভোটার চাইলে তাঁর প্রতিনিধি—পরিবারের সদস্য, দলের এজেন্ট বা অন্য কাউকে—নথি জমা দেওয়ার দায়িত্ব দিতে পারবেন। তবে সে ক্ষেত্রে অনুমতিপত্রের সঙ্গে ভোটারের স্বাক্ষর বা আঙুলের ছাপ থাকা বাধ্যতামূলক।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও রাজ্য সরকারকে সতর্ক করেছে আদালত। এসআইআর প্রক্রিয়ার সময় পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করে শান্তি বজায় রাখতে হবে। পাশাপাশি, পঞ্চায়েত ভবন ও ব্লক অফিসে বসে ভোটারদের কথা শোনার জন্য রাজ্য সরকারকে পর্যাপ্ত কর্মী নিয়োগের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি জেলার জেলাশাসককে এই নির্দেশ কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে বলে জানানো হয়েছে।
এই রায়ের পর নির্বাচন কমিশন ও বিজেপিকে কটাক্ষ করতে ছাড়েননি তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বারাসতের সভা থেকে তিনি বলেন,
“বিজেপির এসআইআর গেম ওভার। সুপ্রিম কোর্ট তৃণমূলের সব দাবি মেনে নিয়েছে। এক কোটি নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছিল, তা বেঁচে গেল। এটা বাংলার মানুষের জয়।”
এসআইআর প্রক্রিয়া ঘিরে যে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হবে, সেই ইঙ্গিত স্পষ্ট করে দিল এই রায়—এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক মহলের একাংশ।



