চার মাসের টানটান অপেক্ষার অবসান। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় সুপ্রিম কোর্টে ঘোষণা হতে চলেছে রাজ্য সরকারি কর্মীদের বহু প্রতীক্ষিত ডিএ মামলার রায়। ১১ নম্বর এজলাসে বিচারপতি সঞ্জয় কারোলের বেঞ্চ এই গুরুত্বপূর্ণ মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে। কেন্দ্রীয় হারে মহার্ঘ ভাতা পাওয়া যাবে কি না—এই এক প্রশ্নের উত্তরেই নির্ধারিত হতে চলেছে লক্ষ লক্ষ রাজ্য সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগীর ভবিষ্যৎ। আর ঠিক রায় ঘোষণার আগের দিনেই স্পষ্ট বার্তা দিলেন মামলাকারী পক্ষের আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য—“আগামীকাল মাঝামাঝি কিছু নেই, সুপ্রিম কোর্ট হয় হ্যাঁ বলবে, নয় তো না।”
বৃহস্পতিবারের রায় নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে রাজ্য সরকারি কর্মীদের মধ্যে। নজরবন্দির সম্পাদক অর্ক সানার সঙ্গে ফোনালাপে আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য স্পষ্ট জানান, এই মামলায় বিভিন্ন স্তরের আদালতেই কর্মীদের পক্ষে রায় এসেছে। তাঁর কথায়, “এই ডিএ মামলায় আমরা শুরু থেকেই জিতে এসেছি। আগামীকাল সুপ্রিম কোর্ট রায় দেবে—আর সেই রায় হবে স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন।” বিকাশবাবুর এই মন্তব্যে কর্মী মহলে আশার পারদ আরও চড়েছে।


উল্লেখযোগ্য ভাবে, চলতি বছরের ৮ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টে ডিএ মামলার চূড়ান্ত শুনানি শেষ হয়েছিল। এরপর চার মাসেরও বেশি সময় কেটে যায় রায়ের অপেক্ষায়। তার আগেই শীর্ষ আদালত রাজ্য সরকারকে বকেয়া ডিএ-র অন্তত ২৫ শতাংশ মিটিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল এবং তার জন্য ছ’সপ্তাহ সময়ও বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু সেই সময়সীমার মধ্যে রাজ্য সরকার মহার্ঘ ভাতা দিতে ব্যর্থ হয়।
পরবর্তীতে রাজ্য সরকার আর্থিক সঙ্কটের যুক্তি দেখিয়ে আদালতের কাছে আরও ছ’মাস সময় চেয়ে আবেদন করে। সেই আবেদনের প্রেক্ষিতেই গত ৪ অগস্ট থেকে ৭ অগস্ট পর্যন্ত টানা চার দিন শুনানি চলে বিচারপতি সঞ্জয় কারোল এবং বিচারপতি মিশ্রের বেঞ্চে। যদিও ১২ অগস্ট নির্ধারিত শুনানি পিছিয়ে যায়। সূত্রের খবর, সেদিন রাজ্যের আইনজীবী কপিল সিব্বল বিশেষ নিবিড় সমীক্ষা (SIR) সংক্রান্ত অন্য মামলায় ব্যস্ত থাকায় ডিএ মামলার শুনানি আর এগোয়নি।


এই মামলার সূত্রপাত কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের সমান হারে রাজ্য সরকারি কর্মীদের ডিএ দেওয়ার দাবিতে। প্রথমে স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রাইব্যুনাল (SAT), তারপর কলকাতা হাই কোর্ট হয়ে মামলাটি পৌঁছয় সুপ্রিম কোর্টে। ২০২২ সালে কলকাতা হাই কোর্ট রাজ্য সরকারি কর্মীদের পক্ষে রায় দিয়ে স্পষ্ট ভাষায় জানায়, ডিএ কোনও সরকারি অনুগ্রহ নয়—এটি কর্মীদের অধিকার। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, কেন্দ্রীয় হারে ডিএ পাওয়ার যোগ্যতা রাজ্য সরকারি কর্মীদেরও রয়েছে।
কিন্তু সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করেই রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়। রাজ্যের যুক্তি ছিল, মহার্ঘ ভাতা মৌলিক অধিকার নয় এবং এটি বাধ্যতামূলকও নয়। কেন্দ্র ও রাজ্যের আর্থিক কাঠামো আলাদা হওয়ায় কেন্দ্রীয় হারের সঙ্গে রাজ্যের তুলনা চলে না। এমনকি ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের বাজেটে বকেয়া ডিএ-র জন্য কোনও বরাদ্দও রাখা হয়নি বলে আদালতকে জানায় রাজ্য।
অন্যদিকে মামলাকারী কর্মী সংগঠনগুলির বক্তব্য, নির্দিষ্ট সময় অন্তর ডিএ দেওয়া সরকারি নীতিরই অংশ। বেতন কমিশনের সুপারিশ মেনে ডিএ দিতে সরকার বাধ্য। খেয়ালখুশি মতো ডিএ আটকে রাখা যায় না। প্রয়োজনে কিস্তিতে হলেও বকেয়া ডিএ মেটানোর দাবি জানানো হয়।
এখন সব নজর সুপ্রিম কোর্টের রায়ের দিকে। এই রায় শুধু পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারি কর্মীদের ভবিষ্যৎই নয়, গোটা দেশের অন্যান্য রাজ্যের কর্মীদের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ আইনি নজির তৈরি করতে পারে বলেই মত আইন বিশেষজ্ঞদের।







