ভোটের মুখে ভোটার তালিকা সংশোধনকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়াল তৃণমূল। এসআইআর (Special Intensive Revision)–এর শুনানি পর্ব শুরু হতেই নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের সুর শোনা গেল তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দোপাধ্যায়–এর কণ্ঠে। রবিবার দলের প্রায় এক লক্ষ নেতা-কর্মীর সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন— শুনানিতে দলের বিএলএ (Booth Level Agent)–দের থাকতেই হবে। কমিশন অনুমতি না দিলে প্রয়োজনে আইনি লড়াইয়ে নামবে দল।
শনিবার থেকে শুরু হয়েছে ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের দ্বিতীয় পর্বের শুনানি। এই পর্বকে সামনে রেখে তৃণমূলের সাংগঠনিক রণকৌশল একেবারে পরিষ্কার করে দিয়েছেন অভিষেক। তাঁর নির্দেশ, এক দিকে শুনানি কক্ষে দলের বিএলএদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে, অন্য দিকে শুনানি কেন্দ্রের বাইরে খুলতে হবে দলীয় সহায়তা শিবির— যাতে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় নথি ও প্রক্রিয়াগত সহায়তা পান।
কমিশনের নিয়ম বনাম তৃণমূলের দাবি
তৃণমূলের অন্দরের খবর, বৈঠকে অভিষেক স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন— নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের শুনানিতে ঢোকার অনুমতি দিচ্ছে না। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞা মানতে রাজি নয় তৃণমূল। তাঁর কথায়, “অনুমতি না দিলে আইনি লড়াই হবে।”
সূত্রের দাবি, দলের সর্বোচ্চ নেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়–র নির্দেশেই বিএলএদের শুনানিকেন্দ্রে থাকার কথা জানানো হয়েছে।
‘ইসির কৌশল’ নিয়ে সরাসরি অভিযোগ
বৈঠকে নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্য নিয়েও তীব্র অভিযোগ তোলেন অভিষেক। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কমিশনের লক্ষ্য— মানুষকে শুনানিকেন্দ্রে দীর্ঘক্ষণ বসিয়ে ক্লান্ত করে তোলা, যাতে তারা ধৈর্য হারিয়ে ফিরে যান। তাতে বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া সহজ হবে।
এই কারণেই বুথস্তরে কারা শুনানিতে ডাক পাচ্ছেন, কেন পাচ্ছেন— তার পূর্ণ নজরদারির নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
কেন বিএলএ থাকা জরুরি— ব্যাখ্যা অভিষেকের
বিএলএদের উপস্থিতি নিয়ে অভিষেকের যুক্তি, এসআইআরের প্রথম পর্বে রাজনৈতিক দলগুলির বিএলএরা যুক্ত ছিলেন। ভোটগ্রহণের সময় প্রতি বুথে এজেন্ট থাকে, গণনাকেন্দ্রেও এজেন্ট থাকে। তাহলে শুনানির সময় রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব থাকবে না কেন?
যদিও রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই অবস্থান তৃণমূলের পক্ষেই সুবিধাজনক— কারণ বুথভিত্তিক শুনানিতে পর্যাপ্ত লোক মোতায়েন করার মতো সাংগঠনিক শক্তি রাজ্যে কার্যত একমাত্র তৃণমূলেরই রয়েছে।
এসআইআরকে ‘যুদ্ধ’ বলে চিহ্নিত
আসন্ন বিধানসভা ভোটের প্রেক্ষিতে এসআইআর–কে ফের এক বার ‘যুদ্ধ’ বলে আখ্যা দেন অভিষেক। বৈঠকে তিনি বলেন, বিজেপির দাবি ছিল রাজ্যে এক কোটি রোহিঙ্গা রয়েছে। অথচ মৃত ও স্থানান্তরিত মিলিয়ে নাম বাদ পড়েছে প্রায় ৫৮ লক্ষ। তাঁর আশঙ্কা, শুনানি পর্বে বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার ‘ষড়যন্ত্র’ আরও প্রকট হতে পারে।
কমিশনের কাছে অভিযোগ ও দিল্লি সফরের ঘোষণা
শুনানি পর্বে প্রবীণ নাগরিকদের হয়রানির অভিযোগ নিয়ে সোমবার রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতরে যাবে তৃণমূলের প্রতিনিধিদল। পাশাপাশি, পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য ভার্চুয়াল শুনানির ব্যবস্থা না থাকার প্রশ্নও তুলেছেন অভিষেক।
তাঁর যুক্তি— যখন সুপ্রিম কোর্টে ভার্চুয়াল শুনানি হয়, প্রধানমন্ত্রী ভার্চুয়াল বক্তৃতা দেন, তখন Election Commission of India কেন সেই পরিকাঠামো গড়ে তুলতে পারবে না? এই প্রশ্ন তুলতেই আগামী ৩১ ডিসেম্বর দিল্লিতে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের দফতরে যাওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন তিনি।
‘ভোট পর্যন্ত নাওয়া-খাওয়া ভুলে কাজ’
রবিবারের বৈঠকে শুরুতে বক্তব্য রাখেন তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সী। তার পর অভিষেক এক দিকে যেমন বিএলএদের কাজের প্রশংসা করেন, তেমনই স্পষ্ট বার্তা দেন— ভোট পর্যন্ত নাওয়া-খাওয়া ভুলে মাঠে থাকতে হবে। সাংগঠনিক ভাবে নির্বাচন কমিশনের উপর চাপ বজায় রাখার নির্দেশও দিয়ে দেন তিনি।
সব মিলিয়ে, এসআইআর–এর শুনানি পর্ব ঘিরে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিয়ে দিল তৃণমূল নেতৃত্ব। ভোটের আগে এই লড়াই কতদূর গড়ায়, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।






