পুলিশের কাজ জনগণের সেবা করা, সরকারের ‘দাস’ হয়ে ওঠা নয়, স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ বম্বে আদালতের

শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও সরকারবিরোধী স্লোগান দেওয়া মৌলিক অধিকার বলে জানিয়ে রাজনৈতিক কর্মীকে শহরছাড়া করার নির্দেশ বাতিল করল বম্বে হাইকোর্ট, পুলিশের ভূমিকায় কড়া মন্তব্য।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

শান্তিপূর্ণভাবে সরকারের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করাই যদি অপরাধ হয়ে যায়, তাহলে গণতন্ত্রের অস্তিত্ব কোথায়? এমনই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে মুম্বই (Mumbai) পুলিশের বিরুদ্ধে কড়া মন্তব্য করল বম্বে হাইকোর্ট (Bombay High Court)। এক রাজনৈতিক কর্মীকে শহর ছাড়ার নির্দেশকে অসাংবিধানিক বলে বাতিল করে আদালত জানিয়েছে, সরকারবিরোধী স্লোগান বা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করা ভারতের সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকার। পুলিশের কাজ জনগণের সেবা করা, সরকারের ‘দাস’ হয়ে ওঠা নয় বলেও স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ আদালতের।

মামলার কেন্দ্রে রয়েছেন সোশ্যালিস্ট ডেমোক্রেটিক পার্টি অফ ইন্ডিয়া (Social Democratic Party of India বা SDPI)-এর সাধারণ সম্পাদক আহমেদ আব্দুল ওয়াহিদ চৌধুরী (Ahmed Abdul Wahid Chowdhury)। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে মুম্বই পুলিশ তাঁকে এক বছরের জন্য শহরের বাইরে থাকার নির্দেশ দেয়। পুলিশের দাবি ছিল, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি মামলা দায়ের হয়েছিল।

পুলিশের অভিযোগ অনুযায়ী, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (Citizenship Amendment Act বা CAA), জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (National Register of Citizens বা NRC), বাবরি মসজিদ (Babri Masjid) এবং জ্ঞানবাপী মসজিদ (Gyanvapi Mosque)-সহ বিভিন্ন ইস্যুতে অনুমতি ছাড়া বিক্ষোভের আয়োজন করেছিলেন ওই রাজনৈতিক কর্মী। সেইসব কর্মসূচিতে ‘বিজেপি সরকার মুর্দাবাদ’ এবং ‘অমিত শাহ মুর্দাবাদ’ স্লোগানও ওঠে বলে অভিযোগ পুলিশের।

অন্যদিকে, আহমেদ আব্দুল ওয়াহিদ চৌধুরীর দাবি ছিল, তাঁর বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আসন্ন স্থানীয় পুরসভা নির্বাচন থেকে তাঁকে দূরে রাখা এবং বিরোধী কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তিনি আদালতে অভিযোগ করেন।

শুনানিতে আবেদনকারীর আইনজীবীরা যুক্তি দেন, তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলি গুরুতর অপরাধের নয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলেও সর্বোচ্চ শাস্তি খুবই সামান্য হতে পারত। তাই এই ধরনের মামলার ভিত্তিতে কোনও নাগরিকের চলাফেরার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া সংবিধানের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।

অন্যদিকে, মহারাষ্ট্র (Maharashtra) সরকারের পক্ষ থেকে পুলিশের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে বলা হয়, প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বারবার অনুমতি ছাড়া জমায়েত করার কারণেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

তবে বিচারপতি মাধব জে. জামদার (Justice Madhav J. Jamdar) তাঁর রায়ে পুলিশের যুক্তি গ্রহণ করেননি। আদালত জানায়, আবেদনকারী জননিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা বা সরকারি সম্পদের জন্য কোনও বাস্তব হুমকি সৃষ্টি করেছিলেন—এমন কোনও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পুলিশ আদালতে দেখাতে পারেনি। ফলে নির্বাসনের নির্দেশের আইনি ভিত্তি নেই।

রায়ে বিচারপতি আরও উল্লেখ করেন, ভারতের সংবিধানের ১৯ এবং ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করেছে। সরকারের নীতির বিরোধিতা করা, রাজনৈতিক স্লোগান দেওয়া কিংবা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নেওয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ। শুধুমাত্র এই কারণ দেখিয়ে কাউকে শহরছাড়া করা সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী।

এই পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বম্বে হাইকোর্ট স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ক্ষমতা অবশ্যই সংবিধানের সীমার মধ্যেই প্রয়োগ করতে হবে। গণতান্ত্রিক দেশে ভিন্নমত ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে দমন করার পরিবর্তে নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষাই প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন