বীরভূমের রাজনৈতিক আবহে শনিবারের বিজয়া সম্মিলনী ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘ সময় পর একই মঞ্চে দেখা মিলল জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের তিন শীর্ষ মুখ— অনুব্রত মণ্ডল (কেষ্ট), সাংসদ শতাব্দী রায়, এবং জেলা সভাধিপতি কাজল শেখ। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশে ঐক্যের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্যই আয়োজন করা হয়েছিল এই সভা। কিন্তু শতাব্দীর ভাষণে তৃণমূল বিভাজন এমনভাবে প্রকাশ পেল, যা কেউ ভাবেননি।
মুরারই-১ ব্লকে তৃণমূলের এই বিজয়া সম্মিলনীতে নেতৃত্বের তিন মুখকে একত্রে বসানো হয়েছিল। কেষ্ট, শতাব্দী ও কাজল— তিনজনই বসেছিলেন পাশাপাশি। লক্ষ্য ছিল, আগামী বিধানসভা নির্বাচনের আগে জেলার নেতৃত্বের মধ্যে যে অতীতের দূরত্ব, তা মুছে ফেলা। কিন্তু ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট হল, সম্পর্কের তলদেশে জমে থাকা ফাটল এখনো অটুট।


সভায় প্রথমেই সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন অনুব্রত মণ্ডল। তিনি বলেন, “আমাকে সিউড়ি যেতে হবে। ৭টার মিটিং ধরতে হবে। সকলকে শুভ বিজয়া।” কেষ্টের ভাষণে কাজলের নাম থাকলেও, কাজলের বক্তৃতায় অনুব্রতের নাম অনুপস্থিত ছিল। এই ঘটনাই অনেকের চোখে ধরা পড়ে। কিন্তু নাটকীয় মুহূর্ত আসে শতাব্দীর ভাষণের সময়।
সাংসদ মাইক্রোফোন ধরতেই মঞ্চে পৌঁছন কাজল শেখ। হঠাৎই সামনের সারির কর্মীরা ‘অনুব্রত মণ্ডল জিন্দাবাদ’ স্লোগান তুলতে শুরু করেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্য একটি গোষ্ঠী ‘কাজল শেখ জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিয়ে পাল্টা জবাব দেয়। শতাব্দীর বক্তব্য পুরোপুরি ঢেকে যায় এই স্লোগান যুদ্ধের মধ্যে।
অপ্রত্যাশিত এই ঘটনায় স্পষ্ট অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ে মঞ্চে। শতাব্দী কিছুক্ষণ মাইক্রোফোন হাতে নীরব থাকেন। তারপর শান্ত গলায় বলেন, “আমরা সবাই তৃণমূল করি। আমাদের লড়াই কংগ্রেস, বিজেপি আর সিপিএমের বিরুদ্ধে হওয়া উচিত। নিজেদের মধ্যে নয়।” কিন্তু ততক্ষণে ক্ষতি হয়ে গেছে। ঐক্যের প্রদর্শনী মঞ্চেই তৃণমূলের বিভাজনের ছবি প্রকাশ্যে চলে এসেছে।


রাজনৈতিক মহলে অনেকে মনে করছেন, শতাব্দী রায়, অনুব্রত মণ্ডল ও কাজল শেখের মধ্যে সমীকরণ বরাবরই জটিল। শতাব্দী ও কাজলের সঙ্গে কেষ্টর সম্পর্ক ছিল মধুর, কিন্তু অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব সময় সময় প্রকাশ পেত। শনিবারের ঘটনা সেই পুরনো দ্বন্দ্বের পুনরাবৃত্তি বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বারবার নির্দেশ দিয়েছে, ভোটের আগে জেলা নেতৃত্বকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। বিজয়া সম্মিলনীও ছিল সেই বার্তা ছড়ানোর মঞ্চ। কিন্তু শতাব্দীর ভাষণে তৃণমূল বিভাজন এভাবে প্রকাশ পেয়ে দলের ভাবমূর্তিতে ধাক্কা লাগল বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
কর্মীদের আলাদা স্লোগান তোলার আচরণ শুধু যে ঐক্যের ভাবমূর্তিকে নষ্ট করেছে তা নয়, আগামী নির্বাচনে দলের সমন্বয় নিয়েও প্রশ্ন তুলে দিল।
শতাব্দীর ভাষণে দেখা গেল অসন্তোষের ছায়া, আর কর্মীদের আচরণে প্রতিফলিত হল স্থানীয় নেতৃত্বের মধ্যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। ঐক্যের মঞ্চে ভাঙনের এই প্রকাশ নিঃসন্দেহে তৃণমূলের জন্য অস্বস্তিকর বার্তা।








