পশ্চিমবঙ্গের নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে স্পষ্ট অবস্থান জানালেন বিশিষ্ট ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। অভয়া কাণ্ডের তদন্ত, চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে ‘থ্রেট কালচার’ বন্ধ এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার সংস্কার—এই তিন বিষয়কে সামনে রেখেই স্বাস্থ্যভবনে প্রথম দিনের বার্তা দিলেন তিনি।
দায়িত্ব গ্রহণের পর শারদ্বত মুখোপাধ্যায় স্পষ্ট ভাষায় জানান, অভয়া কাণ্ডে জড়িত কাউকে রেয়াত করা হবে না। তিনি বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি চিকিৎসক হলেও আইনের চোখে কোনও ছাড় থাকবে না। ঘটনার ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি জানান, কারা ময়নাতদন্ত করেছিলেন এবং কীভাবে তা সম্পন্ন হয়েছিল, তার সমস্ত নথি পুনরায় খতিয়ে দেখা হবে।
নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণে রাজ্যের চিকিৎসক মহলের একাংশের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এ প্রসঙ্গে শারদ্বত বলেন, চিকিৎসক সমাজ দীর্ঘদিন ধরেই চাইছিল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দায়িত্ব এমন কারও হাতে থাকুক, যিনি চিকিৎসা ক্ষেত্রের বাস্তব সমস্যাগুলি কাছ থেকে জানেন।
স্বাস্থ্য দপ্তরের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি জানান, ডেন্টাল এডুকেশন, ফার্মেসি শিক্ষা, সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা এবং বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের পরিকাঠামো—সব ক্ষেত্রেই নজর দেওয়া হবে। একইসঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় একাধিক দুর্বলতা রয়েছে এবং সেগুলি চিহ্নিত করতে কিছুটা সময় লাগবে।
একসময় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নানা ত্রুটি নিয়ে সরব হওয়ার কারণে যে স্বাস্থ্যভবনের দরজা তাঁর জন্য প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, সেই ভবনেই এবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে স্বাস্থ্য পরিষেবায় কঠোর ও স্বচ্ছ প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি দিলেন তিনি।
এদিন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন বলাগড়ের বিধায়ক সুমনা সরকারও। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি জানান, তাঁর প্রধান লক্ষ্য হবে গ্রামীণ ও জেলা স্তরের স্বাস্থ্য পরিষেবার মানোন্নয়ন। জেলা, মহকুমা ও ব্লক হাসপাতালগুলিতে পরিকাঠামো এবং চিকিৎসা পরিষেবা উন্নত করা গেলে বড় শহরের হাসপাতালগুলিতে রোগীর অতিরিক্ত চাপ অনেকটাই কমবে বলে মত তাঁর।
সুমনা আরও বলেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে রোগীদের যাওয়ার প্রবণতা এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। রাজ্যের মেডিক্যাল কলেজ ও সরকারি হাসপাতালগুলিকে আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলার মাধ্যমে সেই প্রবণতা কমিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়েছে নতুন স্বাস্থ্য প্রশাসন।
দীর্ঘ ১৫ বছর পর স্বাস্থ্যভবনের চারতলায় পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং তাঁর সঙ্গে একজন প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। প্রথম দিনেই তাঁরা শীর্ষ স্বাস্থ্যকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন এবং স্বাস্থ্য খাতের অগ্রাধিকার নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা করেন।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পাওয়ার পর শারদ্বত মুখোপাধ্যায় বলেন, এই সাফল্য মূলত সাধারণ মানুষের। জনস্বাস্থ্য শিক্ষার প্রসঙ্গ তুলে তিনি স্কুলস্তরে ‘বেসিক লাইফ সাপোর্ট’ প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করার পক্ষে সওয়াল করেন। এমনকি এই প্রশিক্ষণ সম্পূর্ণ না করলে পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ না করার প্রস্তাবও দেন তিনি।
চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে দীর্ঘদিনের ‘থ্রেট কালচার’ নিয়েও কড়া বার্তা দিয়েছেন নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, কোনও ধরনের দাদাগিরি বা ভয় দেখানোর রাজনীতি বরদাস্ত করা হবে না। দোষী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে নিয়মমাফিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ, জবাবদিহিমূলক ও রোগীকেন্দ্রিক করে তোলাই এখন নতুন প্রশাসনের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।



