বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবির পর দলের অন্দরে আত্মসমালোচনার সুর আরও জোরালো হচ্ছে। এবার সেই তালিকায় যোগ দিলেন সাংসদ রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়। মানুষের রায়কে সম্পূর্ণভাবে মেনে নিয়ে তিনি স্পষ্ট জানালেন, শুধুমাত্র বিরোধীদের অভিযোগে নয়, দলের কিছু ভুল সিদ্ধান্ত, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং দুর্নীতির অভিযোগের কারণেও এই ফলাফল এসেছে। একইসঙ্গে নতুন সরকারের কিছু উদ্যোগের প্রশংসাও করেছেন তিনি।
রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, ভোটে লড়াই কঠিন হবে তা আগে থেকেই আন্দাজ ছিল। কিন্তু দলের এমন বিপর্যয়কর ফল হবে, তা তিনি বা দলের কর্মীরা কেউই কল্পনা করেননি। তাঁর কথায়, গণতন্ত্রে মানুষের রায়ের ঊর্ধ্বে কিছু নেই। এই নির্বাচনের ফলই প্রমাণ করে দিয়েছে যে, একাংশ ভোটার তৃণমূলের উপর আস্থা হারিয়েছিলেন।


দলের পরাজয়ের নেপথ্যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের প্রসঙ্গও সামনে এনেছেন সাংসদ। নিজের লোকসভা কেন্দ্রের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে তাঁকে বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল। স্থানীয় স্তরের কিছু সিদ্ধান্ত ও ব্যক্তিগত অহমিকার কারণে দলের ক্ষতি হয়েছে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
এই প্রসঙ্গে তিনি সরাসরি কোনও ব্যক্তিকে দায়ী না করলেও স্বীকার করেছেন, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের অভাব ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর মতে, সংগঠনের ভিতরে থাকা মতভেদ অনেক সময় সাধারণ ভোটারদের কাছেও নেতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেয়।
তবে পরাজয়ের পরেও রাজনৈতিক সৌজন্যের বার্তা দিয়েছেন রচনা। নির্বাচিত বিজেপি বিধায়কদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, উন্নয়নের স্বার্থে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সাংসদ হিসেবে তিনি দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের জন্য কাজ করতে চান বলেও জানিয়েছেন।


নতুন সরকারের কাজ নিয়েও ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন রচনা। তাঁর দাবি, গত কয়েক সপ্তাহে নতুন প্রশাসনের কাজের পরিকল্পনা ও কর্মসূচি সাধারণ মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন এবং উন্নয়নমূলক প্রকল্পের উপর জোর দেওয়ার বিষয়টিকে তিনি স্বাগত জানিয়েছেন।
তৃণমূলের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ওঠা দুর্নীতি ও কাটমানির অভিযোগ নিয়েও প্রথমবারের মতো স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন সাংসদ। তাঁর কথায়, কিছু ভুল অবশ্যই হয়েছে এবং সেই কারণেই ভোটের ফলাফলে তার প্রতিফলন দেখা গিয়েছে। তবে তিনি মনে করেন, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে সব অভিযোগ সবসময় পৌঁছত কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
টলিউডে তথাকথিত ‘ব্যান কালচার’ বা শিল্পীদের কাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখার অভিযোগেরও সমালোচনা করেছেন রচনা। তাঁর মতে, কোনও শিল্পীর কাজের সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া বা তাঁকে একঘরে করে রাখার সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ভবিষ্যতে রাজনীতিতে থাকবেন কি না, সেই প্রশ্নেরও সরাসরি উত্তর দিয়েছেন সাংসদ। আপাতত মানুষের জন্য কাজ করাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য বলে জানিয়ে তিনি বলেন, আগামী কয়েক বছর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার পরই ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেবেন।
সব মিলিয়ে, তৃণমূলের সাম্প্রতিক পরাজয়ের কারণ নিয়ে দলের ভিতর থেকে যে আত্মসমালোচনার সুর শোনা যাচ্ছে, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য সেই আলোচনাকে আরও জোরালো করল। একইসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দিলেন, মানুষের রায়কে সম্মান জানিয়েই রাজনীতির আগামী পথ নির্ধারণ হওয়া উচিত।
সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে
Google News এবং Google Discover-এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।



