নজরবন্দি ব্যুরো: ৯ অগস্ট, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৪২ সালের এই দিনেই মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল ঐতিহাসিক ভারত ছাড়ো আন্দোলন (Quit India Movement)। আন্দোলনের ৮৪তম বার্ষিকীতে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগকে স্মরণ করে শ্রদ্ধা জানালেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। একই দিনে ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার সময়ে গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনে কারাবন্দি ৩২৫ জনকে ‘পশ্চিমবঙ্গ লোকতন্ত্র সেনানি সম্মান’ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।
সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া বার্তায় মুখ্যমন্ত্রী ১৯৪২-এর আন্দোলনের কথা স্মরণ করেন। তাঁর বক্তব্য, পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতার লক্ষ্যে সারা দেশ একসঙ্গে আওয়াজ তুলেছিল—‘করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে’।
শুভেন্দু লেখেন, সেই আন্দোলনে দেশের হাজার হাজার মানুষ আত্মত্যাগ করেছিলেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল একটাই—আগামী প্রজন্ম যাতে স্বাধীন দেশের মুক্ত পরিবেশে জীবনযাপন করতে পারে।
৯ অগস্টের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং শ্রদ্ধা জানান। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, তাঁদের সাহস, সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগের উপরই স্বাধীন ভারতের ভিত্তি গড়ে উঠেছে।
এদিকে এ বছরের ৯ অগস্ট পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতেও আলাদা তাৎপর্য বহন করছে। নবান্নে প্রথমবার আয়োজন করা হচ্ছে ‘পশ্চিমবঙ্গ লোকতন্ত্র সেনানি সম্মান’। ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার সময়ে গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনে অংশ নিয়ে যাঁরা জেলে গিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্য থেকে ৩২৫ জনকে এই সম্মান দেওয়া হবে।
জানা গিয়েছে, রাজ্যের প্রায় প্রতিটি জেলা থেকেই সম্মানপ্রাপকরা অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। নবান্নের তরফে তাঁদের উপস্থিতি, যাতায়াত এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী নিজে তাঁদের সম্মান জানাবেন।
১৯৭৫ সালের ২৫ জুন দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়েছিল। প্রায় ২১ মাস ধরে চলা সেই পর্বে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার উপর নিয়ন্ত্রণ, বিরোধী নেতাদের গ্রেফতার এবং নাগরিক স্বাধীনতা সীমিত করার মতো একাধিক ঘটনা নিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। ১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করা হয়।
রাজ্য সরকারের এই সম্মাননা উদ্যোগ সেই সময় গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষদের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এ বছর জরুরি অবস্থার সেই অধ্যায়ের ৫১ বছর পূর্ণ হয়েছে। ফলে ৯ অগস্টের অনুষ্ঠানটি স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মরণ এবং গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনের স্বীকৃতি—দুই দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ।
সরকারি প্রকল্পের আওতায় সম্মানপ্রাপকদের জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা সম্মানমূল্য দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এর পাশাপাশি মাসে ১ হাজার টাকা চিকিৎসা-সহায়তা, সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ওষুধের সুবিধা এবং রাজ্যের রাষ্ট্রায়ত্ত গণপরিবহণে বিনামূল্যে যাতায়াতের সুবিধার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
সম্মানপ্রাপকদের পরিচয়পত্র দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। কোনও উপভোক্তার মৃত্যু হলে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী তাঁর স্বামী বা স্ত্রীও প্রকল্পের সুবিধা পাবেন। অর্থাৎ শুধুমাত্র এককালীন সম্মান নয়, সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলির জন্য দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
একদিকে ১৯৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলন, অন্যদিকে স্বাধীনতার কয়েক দশক পরে ১৯৭৫-এর জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সময়ের ইতিহাসকে একই দিনে স্মরণ করছে পশ্চিমবঙ্গ। ৯ অগস্ট তাই এ বার রাজ্যে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি শ্রদ্ধার পাশাপাশি গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনের স্বীকৃতিরও দিন হয়ে উঠছে।



