পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি গত চার মাস ধরে ঘুরপাক খাচ্ছিল এসআইআর (বিশেষ নিবিড় সমীক্ষা) ইস্যুকে কেন্দ্র করে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সফর ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক হঠাৎ করেই রাজ্যের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু বদলে দিয়েছে। এখন রাজ্য রাজনীতির মূল অক্ষ হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রপতির ‘অসম্মান’ বিতর্ক এবং তার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে আদিবাসী রাজনীতির প্রশ্ন।
রাষ্ট্রপতির ‘অপমান’ ইস্যুতে তৃণমূল কংগ্রেসকে নিশানা করে ময়দানে নেমেছে বিজেপি। তাদের অভিযোগ, রাজ্য সরকারের আচরণ শুধু রাষ্ট্রপতির প্রতি অসম্মান নয়, তা গোটা আদিবাসী সমাজেরও অপমান। পাল্টা তৃণমূলের দাবি, বিজেপি রাজনৈতিক স্বার্থে রাষ্ট্রপতিকে ব্যবহার করছে। এই সংঘাতে তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে দুই দলই সামনে আনছে নিজেদের আদিবাসী নেতৃত্বকে।


তৃণমূলের তরফে মন্ত্রী বীরবাহা হাঁসদাকে সামনে আনা হয়েছে। অন্যদিকে বিজেপির হয়ে সক্রিয় হয়েছেন মালদহ উত্তরের সাংসদ খগেন মুর্মু। শুধু তাই নয়, বিজেপি এই ইস্যুতে মহিলা নেতৃত্বকেও সামনে এনেছে। দলের সাংসদ লকেট চট্টোপাধ্যায়ও তৃণমূলের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন।
এই রাজনৈতিক সংঘর্ষের সূচনা শনিবার সন্ধ্যায়। তৃণমূলের হয়ে প্রথমে সরব হন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পাল্টা বিজেপির পক্ষ থেকে সরাসরি আক্রমণ শানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এরপর দুই শিবির থেকেই একের পর এক নেতা ময়দানে নামেন। মমতার পরে তৃণমূলের তরফে বক্তব্য রাখেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্যদিকে মোদীর পর বিজেপির পক্ষে সরব হন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।
শনিবার রাত থেকেই বিজেপির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা সামাজিক মাধ্যমে তৃণমূলকে আক্রমণ করতে শুরু করেন। সেই তালিকায় ছিলেন বিভিন্ন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এবং দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। এর পাশাপাশি বিজেপির জনজাতি মোর্চাকেও সক্রিয় করা হয়েছে।


রবিবার রাজ্যের বিভিন্ন আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় বিক্ষোভের ছবি সামনে আসে। কোথাও টায়ার জ্বালিয়ে পথ অবরোধ, কোথাও প্রতিবাদ মিছিল—বিভিন্ন জেলায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিজেপির দাবি, এই বিক্ষোভ ‘স্বতঃস্ফূর্ত’। তবে দলীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, শনিবার রাত থেকেই জনজাতি মোর্চার সংগঠন সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় যোগাযোগ করা হয়।
অন্যদিকে তৃণমূলও পাল্টা রাজনৈতিক আক্রমণ জারি রেখেছে। ধর্মতলার ধর্নামঞ্চ থেকে শুরু করে বিভিন্ন জনসভায় পুরনো একটি ছবি দেখিয়ে তৃণমূল দাবি করছে, রাষ্ট্রপতির প্রতি অসম্মান দেখিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদী নিজেই। সেই ছবিতে দেখা যায়, রাষ্ট্রপতি দাঁড়িয়ে থাকলেও মোদী বসে রয়েছেন।
তৃণমূল নেতারা বক্তৃতায় রামমন্দির উদ্বোধনের সময় রাষ্ট্রপতিকে আমন্ত্রণ না জানানোর ঘটনাও তুলে ধরছেন। তাঁদের দাবি, বিজেপি এখন রাজনৈতিক সুবিধার জন্য রাষ্ট্রপতির প্রসঙ্গ ব্যবহার করছে।
সব মিলিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, এসআইআর ইস্যুকে ছাপিয়ে এখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি নতুন মোড় নিয়েছে। রাষ্ট্রপতি বিতর্ককে ঘিরে আদিবাসী ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি এখন রাজ্যের প্রধান রাজনৈতিক আলোচনায় পরিণত হয়েছে।








