রাজ্য সিপিএমের অন্দরে তীব্র অস্বস্তি তৈরি করে প্রাক্তন ছাত্রনেতা প্রতীক-উর রহমান সরাসরি প্রশ্ন তুললেন দলীয় নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে। রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমকে চিঠি দিয়ে রাজ্য, জেলা কমিটি এবং প্রাথমিক সদস্যপদ ছাড়ার কথা জানানোর ৪৮ ঘণ্টা পর এক বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করলেন—দল তাঁকে কার্যত ‘তিন তালাক’ দিয়েছে। গোপন তথ্য ফাঁস থেকে ‘সেলিব্রিটি কালচার’—একাধিক অভিযোগ তুলে তিনি স্পষ্ট বার্তা দিলেন, “দলকে বাঁচাতে চাইলে কালপ্রিটদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন, নইলে আমি চুপ থাকব না।”
প্রতীক-উরের বক্তব্য, তিনি চিঠি দিয়েছিলেন সরাসরি রাজ্য সম্পাদককে। কিন্তু সেই চিঠির প্রেক্ষিতে সেলিমের তরফে কোনও যোগাযোগ হয়নি। প্রবীণ নেতা বিমান বসুর সঙ্গে ফোনে কথা হলেও, দলীয় সিদ্ধান্ত সম্পর্কে স্পষ্ট বার্তা পাননি বলে দাবি তাঁর।
চিঠি রাজ্য কমিটির হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই তা সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতীক-উরের অভিযোগ, “গোপনীয়তা ভেঙে তথ্য বাইরে যাচ্ছে। কারা ফাঁস করছে, খুঁজে বের করা হোক। সবার ফোন ফরেনসিক পরীক্ষায় পাঠানো হোক, আমারটাও দিতে রাজি।”
‘রাগ পার্টির উপর নয়, কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে’
তাঁর ক্ষোভ দলের বিরুদ্ধে নয়, বরং নেতৃত্বের একাংশের বিরুদ্ধে—এ কথা বারবার জোর দিয়ে বলেছেন প্রতীক-উর। “এই পার্টির জন্য প্রাণ দিতে বসেছিলাম। এই পার্টির জন্য অসংখ্য কমরেড খুন হয়েওছেন। কিন্তু কিছু ব্যক্তি হাজার হাজার কর্মীকে চুপ করিয়ে রাখতে চান। আমার রাগ পার্টির উপর নয়। পার্টিকে চালান এমন কিছু ব্যক্তির উপর আমার রাগ, যাঁরা হাজার হাজার প্রতীক-উরকে প্রতিদিন চুপ করিয়ে রাখতে চান, আধিপত্য দেখাতে চান। এমন কিছু ব্যক্তি আছেন, যাঁরা নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করছেন। পার্টির কাঠামো ভেঙে দেওয়া হচ্ছে,” মন্তব্য তাঁর।
দলের মধ্যে ‘সেলিব্রিটি কালচার’ তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ তোলেন তিনি। জেলায় বক্তা নির্বাচনের ক্ষেত্রে টেলিভিশনে পরিচিত মুখদের অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতাকে কটাক্ষ করে বলেন, “কমিউনিস্ট পার্টিতে এ সংস্কৃতি চলতে পারে না।”
প্রার্থী হওয়া থেকে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ হয়ে যাওয়া
ডায়মন্ড হারবার লোকসভা আসনে প্রার্থী হওয়ার প্রসঙ্গেও বিস্তারে কথা বলেন প্রতীক-উর। প্রথমে অন্য নাম শোনা গেলেও পরে তাঁকেই প্রার্থী করা হয়। আর্থিক ও মানসিক প্রস্তুতির অভাবের কথা জানানো সত্ত্বেও তাঁকে লড়তে বলা হয় বলে দাবি তাঁর।
তারপর থেকেই তাঁকে ধীরে ধীরে সংগঠনের কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বলেও অভিযোগ। “আমার নাম প্রতীক-উর রহমান। সংখ্যালঘু রাজনীতি করেছি বলেই হয়তো আজ এই পরিস্থিতি,” বলেন তিনি।
‘ডিভোর্স নয়, স্পষ্ট জবাব চাই’
দলের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে তাঁর ভাষা আরও তীব্র। “আমি ডিভোর্স চাইনি। সংসার করতে চাইছি। যদি না নেন, স্পষ্ট করে বলুন—তালাক, তালাক, তালাক। ধোঁয়াশা রাখবেন না,” মন্তব্য তাঁর। প্রশ্নহীন আনুগত্যে তিনি বিশ্বাসী নন বলেও জানান।
রাজনীতি ছাড়বেন না
সিপিএম ছাড়লেও রাজনীতি ছাড়ার প্রশ্নই নেই—এ কথা স্পষ্ট করেছেন প্রতীক-উর। “আমি রাজনীতির ছাত্র। সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে রাজনীতিতে এসেছি। পথের বাঁকে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু বাঁকটা পার হবই,” বলেন তিনি।
তৃণমূলে যোগদানের জল্পনা প্রসঙ্গে সরাসরি কিছু না বললেও ভবিষ্যৎ নিয়ে দরজা খোলা রাখলেন।
রাজ্য সিপিএম নেতৃত্ব এই বিস্ফোরক মন্তব্যের কী জবাব দেয়, এখন রাজনৈতিক মহলের নজর সেদিকেই।



