মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধীদের আন্দোলনের পাল্টা এবার রাস্তায় নামল বিজেপি। ‘গণতন্ত্র বাঁচাও, অরাজকতা হটাও’ স্লোগানকে সামনে রেখে সোমবার কলকাতায় মেগা পদযাত্রার আয়োজন করে গেরুয়া শিবির। কলেজ স্ট্রিট থেকে শুরু হয়ে মিছিল এগোয় ধর্মতলার দিকে। নেতৃত্বে ছিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতীন নবীন (Nitin Nabin)। আপনার দেওয়া ঘটনাবিবরণ অনুযায়ী, মিছিলে তাঁর সঙ্গে প্রথম সারিতে হাঁটেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) এবং রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya)। তিন নেতার কাঁধেই ছিল জাতীয় পতাকা।
বিজেপির এই কর্মসূচি শুধু কলকাতায় সীমাবদ্ধ নয়। বিরোধীদের এসআইআর-বিরোধী প্রচার এবং ‘ভোট চুরি’র অভিযোগের জবাব দিতে একাধিক রাজ্যে পদযাত্রা ও জনসংযোগ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে দল। কলকাতার পাশাপাশি সোমবার হায়দরাবাদে একই স্লোগানে পদযাত্রায় অংশ নেওয়ার কথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের।
সোমবার দুপুরে কলকাতা বিমানবন্দরে পৌঁছন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতীন নবীন। তাঁকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং রাজ্য বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। সেখান থেকে তাঁরা কলেজ স্ট্রিটের উদ্দেশে রওনা দেন। মিছিল শুরুর আগে থেকেই এলাকায় জড়ো হতে থাকেন বিজেপির নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা।
দলের ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, বিকেল ৩টেয় কলেজ স্ট্রিট থেকে পদযাত্রা শুরু হওয়ার কথা ছিল। গন্তব্য ধর্মতলা বা এসপ্ল্যানেড। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মিছিলের উদ্দেশ্য ছিল বিরোধীদের রাজনৈতিক প্রচারের পাল্টা জনমত তৈরি করা। বিজেপির বক্তব্য, বিরোধীরা নির্বাচিত সরকারগুলিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে এবং এসআইআর নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
কলকাতার মিছিলে বিজেপির একাধিক রাজ্য নেতা ও কর্মী-সমর্থক অংশ নেন। জমায়েতে দেখা যায় দলের মুখপাত্র দেবজিৎ সরকারকেও। তাঁর বক্তব্য, বিরোধীদের অরাজকতা ও মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র রক্ষার উদ্দেশ্যেই এই পদযাত্রা। বিজেপির দাবি, সাধারণ মানুষ সত্যের পাশে রয়েছেন।
১ নভেম্বর দিল্লির রামলীলা ময়দানে বড় সমাবেশ করে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA)। সেখানে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি তোলা হয়। এসআইআর প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিরোধী নেতারা। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী-সহ একাধিক বিরোধী নেতা নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে সরব হন।
এই সমাবেশে ককরোচ জনতা পার্টি বা Cockroach Janta Party-ও সমর্থন জানিয়েছিল। তাদের অভিযোগ, এসআইআর প্রক্রিয়ার ফলে যোগ্য ভোটারদের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিও জানিয়েছে দলটি।
বিজেপির দাবি, বিরোধীরা এসআইআর নিয়ে ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে। সেই প্রচারের জবাব দিতেই দেশজুড়ে ‘গণতন্ত্র বাঁচাও, অরাজকতা হটাও’ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। বিজেপির কাছে এই পদযাত্রা নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষে জনমত তৈরির প্রচার। অন্যদিকে বিরোধীদের বক্তব্য, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে যোগ্য নাগরিকদের ভোটাধিকার যাতে ক্ষুণ্ণ না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
একই দিনে হায়দরাবাদেও পদযাত্রার কর্মসূচি নেয় বিজেপি। সেখানে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের। বাসিরবাগের বাবু জগজীবন রাম মূর্তির সামনে থেকে পদযাত্রা শুরু হয়ে মোজামজাহি মার্কেটে শেষ হওয়ার কথা। তেলঙ্গানা বিজেপির নেতারা জানিয়েছেন, এসআইআর নিয়ে কংগ্রেসের প্রচারের জবাব দিতেই এই কর্মসূচি।
অমিত শাহের বক্তব্যেও বিরোধীদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক সুর শোনা যায়। তাঁর অভিযোগ, বারবার নির্বাচনে পরাজয়ের পর কংগ্রেস অরাজকতার মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করছে এবং গণতন্ত্রকে দুর্বল করতে চাইছে। দিল্লির বিরোধী সমাবেশের পরেই এই মন্তব্য করেন তিনি।
কলকাতায় আসার আগে বিহারের ভাগলপুরে বিজেপির একই কর্মসূচিতে অংশ নেন নীতীন নবীন। সেখানে বিরোধীদের উদ্দেশে তাঁর বক্তব্য ছিল, তাঁদের লক্ষ্য ক্ষমতা দখল করা, অন্যদিকে বিজেপির কাছে সংবিধান ও গণতন্ত্র রক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এসআইআর নিয়ে বিরোধীদের প্রশ্নের জবাবে তিনি তামিলনাড়ু ও কেরলের নির্বাচনের প্রসঙ্গও তোলেন। তাঁর যুক্তি, ওই রাজ্যগুলিতে এসআইআর প্রক্রিয়ার পরেও বিরোধীরা জয় পেয়েছে। তাই শুধু ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার যুক্তি নেই বলে দাবি করেন বিজেপি সভাপতি।
বিজেপির এই কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সিপিএমও। দলের বিধায়ক মুস্তাফিজুর রহমান রানা বলেন, বিরোধীদের আন্দোলনের প্রভাব পশ্চিমবঙ্গে সেভাবে পড়েনি। রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের মাত্র ছয় মাসের মধ্যে কেন এই ধরনের মিছিলের প্রয়োজন হল, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
ফলে একদিকে নির্বাচন কমিশন ও এসআইআর নিয়ে বিরোধীদের আন্দোলন, অন্যদিকে তার পাল্টা বিজেপির দেশজোড়া পদযাত্রা—এই দুই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে সংঘাত তৈরি হয়েছে। কলকাতার রাজপথের এই মিছিলও সেই রাজনৈতিক টানাপড়েনেরই অংশ।



