জামিন চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে ভর্ৎসিত পার্থ চট্টোপাধ্যায়, নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় তীব্র মন্তব্য শীর্ষ আদালতের
নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় জামিনের জন্য সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় (Partha Chatterjee)। কিন্তু শীর্ষ আদালত তাঁর এই আবেদনে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ভর্ৎসনা করে। বিচারপতি সূর্যকান্ত শর্মা সাফ জানিয়ে দেন, অন্য অভিযুক্তদের সঙ্গে পার্থর নিজের তুলনা করা অনুচিত, কারণ তাঁরা কেউ শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন না।
জামিনের আবেদনে পার্থর যুক্তি এবং আদালতের প্রতিক্রিয়া
পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টে যুক্তি দেখানো হয় যে, অর্পিতা মুখোপাধ্যায় এবং মানিক ভট্টাচার্যের মতো অভিযুক্তরা জামিন পেয়েছেন, তাই তিনিও জামিনের অধিকারী। কিন্তু বিচারপতির পাল্টা মন্তব্য, “আপনি অন্যদের সঙ্গে তুলনা করতে পারেন না। আপনি শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন এবং নিয়োগ দুর্নীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।”
পার্থের উদ্দেশ্যে আরও বলেন, “লজ্জিত হওয়া উচিত, কারণ আপনার অধীনে এসব কাজ হয়েছে। বাকিরা আপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন না। আপনি তাঁদের মতো নন।”
অর্পিতার বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া সম্পত্তি এবং আদালতের পর্যবেক্ষণ
নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় তদন্তে অর্পিতা মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি থেকে নগদ ৫০ কোটি টাকা ও বিপুল পরিমাণ গয়না উদ্ধার হয়। এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED) জানায়, এই সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে অর্পিতা দাবি করেছেন, “এই টাকার সঙ্গে আমার কোনও যোগ নেই। যা বলার পার্থ চট্টোপাধ্যায়ই বলবেন।”
অন্যদিকে, পার্থর আইনজীবী দাবি করেন, অর্পিতার সঙ্গে তাঁর কোনও ব্যক্তিগত সম্পর্ক নেই। কিন্তু ED পাল্টা যুক্তি দেয় যে, অর্পিতা পার্থকে ভয় পাচ্ছেন এবং তাঁর জামিন হলে তথ্যপ্রমাণ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জামিন আবেদন এবং চার্জশিট না জমা দেওয়ার প্রসঙ্গ
পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টে দাবি করা হয়, “গ্রেফতার হওয়ার পর আড়াই বছর কেটে গিয়েছে, কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনও চার্জশিট জমা পড়েনি।”
তাঁর আইনজীবী মুকুল রোহতগি আরও জানান, “পার্থর বয়স এবং শারীরিক অসুস্থতা বিবেচনা করে জামিন দেওয়া উচিত। যে মামলায় সর্বোচ্চ সাত বছরের শাস্তি হতে পারে, সেই মামলায় তিনি ইতিমধ্যেই এর এক তৃতীয়াংশ সময় জেলে কাটিয়েছেন।”
তবে আদালত এই যুক্তি গ্রহণ করেনি এবং পার্থর জামিন আবেদন খারিজ করে দেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণ: কেন পার্থর জামিন প্রাপ্য নয়?
- মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব:
বিচারপতির মতে, পার্থ চট্টোপাধ্যায় শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দুর্নীতির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। তাই তাঁকে অন্য অভিযুক্তদের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। - তথ্যপ্রমাণ লোপাটের আশঙ্কা:
ED-এর দাবি অনুযায়ী, পার্থ জামিন পেলে তদন্ত বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং প্রমাণ লোপাটের আশঙ্কা রয়েছে। - জনস্বার্থে গুরুত্ব:
শিক্ষা সংক্রান্ত দুর্নীতি সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রকে আঘাত করে। তাই এই ধরনের মামলায় কঠোর অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন আদালত।
নিয়োগ দুর্নীতি মামলার প্রেক্ষাপট
পার্থ চট্টোপাধ্যায় যখন রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন, তখন শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক দুর্নীতি হয় বলে অভিযোগ। নিয়োগ দুর্নীতির তদন্তে নেমে ED পার্থ এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী অর্পিতা মুখোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রচুর অর্থ এবং সম্পত্তির অনিয়মের প্রমাণ পায়।
অর্পিতা সম্প্রতি জামিন পেলেও পার্থর বিরুদ্ধে অপরাধের গভীরতা বেশি থাকায় তাঁর আবেদন খারিজ হয়েছে।
পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের জামিন আবেদন সুপ্রিম কোর্টে খারিজ হওয়া প্রমাণ করে যে, দায়িত্বশীল পদে থেকে দুর্নীতিতে জড়িত থাকলে তার দায় আরও গুরুতর হয়। নিয়োগ দুর্নীতি মামলার তদন্ত এবং বিচারে এই সিদ্ধান্ত অন্য অভিযুক্তদের জন্যও একটি বার্তা হতে পারে।



