ইউপিআই (UPI) লেনদেনে নতুন মাশুল কাঠামো নিয়ে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সরব কংগ্রেস। ঠিক সেই সময়ই জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা এই সিদ্ধান্তের নির্দিষ্ট অংশকে সমর্থন করলেন। তাঁর বক্তব্য, ইউপিআই পরিকাঠামো চালানো ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ রয়েছে এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক লেনদেনে মাশুল থাকা নিয়ে তাঁর আপত্তি নেই।
ওমর অবশ্য স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এই চার্জ সাধারণ মানুষের সমস্ত ইউপিআই লেনদেনের উপর চাপানো হচ্ছে না। ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির টাকা পাঠানো সম্পূর্ণ বিনামূল্যেই থাকবে। একই ভাবে ₹২,০০০ পর্যন্ত নির্দিষ্ট মার্চেন্ট লেনদেনেও MDR থাকবে না। কেন্দ্রের ঘোষণায় বলা হয়েছে, ₹২,০০০-এর বেশি নির্দিষ্ট Person-to-Merchant বা P2M লেনদেনে ০.৪ শতাংশ MDR কার্যকর হবে।
ওমরের যুক্তি, এতদিন কোনও পরিষেবা বিনামূল্যে পাওয়া গেলে তার পিছনে থাকা পরিকাঠামোর খরচ অনেক সময় চোখে পড়ে না। তাঁর মতে, সাধারণ গ্রাহকের উপর সরাসরি বোঝা চাপানো উচিত নয়; কিন্তু বড় সংস্থাগুলি ইউপিআই ব্যবহার করে ব্যবসায়িক সুবিধা পেলে তাদের ক্ষেত্রে মাশুলের ব্যবস্থা নিয়ে আপত্তির কারণ দেখছেন না তিনি।
কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যাখ্যাও একই জায়গায়। অর্থ মন্ত্রক জানিয়েছে, নতুন MDR কোনও কর নয় এবং এই অর্থ সরকার বা NPCI-এর রাজস্ব হিসেবে নেওয়া হবে না। পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যাঙ্ক, পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার এবং অ্যাপ সংস্থাগুলির মধ্যে এই অর্থ বণ্টিত হবে। সরকারের দাবি, ইউপিআই ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থায়িত্ব, প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো ও নিরাপত্তার জন্য এই কাঠামো আনা হয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ₹৭৫,০০০ বা তার বেশি নির্দিষ্ট P2M লেনদেনে MDR-এর সর্বোচ্চ সীমা প্রতি লেনদেনে ₹৩০০। আবার রেল, টেলিকম, বিমা, জ্বালানি ও কৃষি-ইনপুটের মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ₹২,০০০-এর বেশি লেনদেনে ৫ টাকা ফ্ল্যাট MDR নির্ধারণ করা হয়েছে। ছোট ব্যবসায়ীদের জন্যও শূন্য-MDR কাঠামোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত নিয়েই কংগ্রেস কেন্দ্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রমণ শুরু করেছে। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেছেন, ইউপিআইয়ের উপর মাশুল চাপানোর সিদ্ধান্তের পিছনে আমেরিকার চাপ রয়েছে এবং এর ফলে মার্কিন সংস্থাগুলি লাভবান হতে পারে। তিনি কেন্দ্রকে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারেরও দাবি জানিয়েছেন। তবে এই বিদেশি চাপের অভিযোগ কেন্দ্রীয় সরকার অস্বীকার করেছে।
ফলে ইউপিআইয়ের মাশুল এখন শুধু অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই; তা সরাসরি রাজনৈতিক সংঘাতের বিষয়ও হয়ে উঠেছে। কংগ্রেস যেখানে নতুন MDR কাঠামোর বিরোধিতা করছে, সেখানে তাদেরই ‘ইন্ডিয়া’ জোটের শরিক ন্যাশনাল কনফারেন্সের নেতা ওমর আবদুল্লার অবস্থান আলাদা।
তবে এই প্রথম নয়। জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম্’ নিয়েও কংগ্রেস ও ন্যাশনাল কনফারেন্সের মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে। কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটি দলীয় কর্মসূচিতে গানটির প্রথম দুই স্তবক গাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। অন্যদিকে, জম্মু ও কাশ্মীরের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনে ‘বন্দে মাতরম্’-এর সম্পূর্ণ সংস্করণ পরিবেশিত হয়, যেখানে উপস্থিত ছিলেন ওমর আবদুল্লা।
এর পর কংগ্রেসের অবস্থানের জবাবে ওমর জানিয়েছিলেন, ন্যাশনাল কনফারেন্স ঐতিহাসিকভাবে ‘বন্দে মাতরম্’কে গ্রহণ করেনি এবং ভবিষ্যতেও তাদের অবস্থান বদলাচ্ছে না। কিন্তু কোনও আইন বা সরকারি বিধি কার্যকর থাকলে তা মানার বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অর্থাৎ, ইউপিআই হোক বা ‘বন্দে মাতরম্’—দুটি পৃথক ইস্যুতেই কংগ্রেস ও ন্যাশনাল কনফারেন্সের রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে। যদিও জোট রাজনীতিতে কোনও একটি বিষয়ে মতপার্থক্য থাকা মানেই সামগ্রিক জোট ভেঙে যাওয়ার ইঙ্গিত নয়, তবু এই ঘটনাগুলি ‘ইন্ডিয়া’ জোটের শরিকদের মধ্যে নীতিগত সমন্বয়ের প্রশ্নটি সামনে এনেছে।
ইউপিআইয়ের ক্ষেত্রে এখন মূল প্রশ্নটি হল, নতুন MDR কাঠামো বাস্তবে ব্যবসায়ী, পেমেন্ট সংস্থা এবং গ্রাহকদের উপর কী প্রভাব ফেলে। কেন্দ্র বলছে, সাধারণ মানুষ ও ছোট ব্যবসায়ীদের সুরক্ষিত রেখেই পরিকাঠামোর খরচের জন্য নতুন ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিরোধীদের আশঙ্কা, সরাসরি গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা না নেওয়া হলেও ব্যবসায়ীরা কোনওভাবে সেই খরচের বোঝা ক্রেতার উপর চাপাতে পারেন। এই প্রভাব কতটা বাস্তব হয়, তা নির্ভর করবে নতুন ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগের উপর।
রাজনীতির ময়দানে অবশ্য বিতর্ক ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। আর সেই বিতর্কের মধ্যেই কংগ্রেসের আপত্তির বিপরীতে ওমর আবদুল্লার অবস্থান ‘ইন্ডিয়া’ জোটের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যকে আরও একবার সামনে নিয়ে এল।



