একসময় কলকাতার বনেদি বাড়িগুলিতে দশমীর দিনে নীলকণ্ঠ পাখি উড়ানো ছিল বাঙালির সংস্কৃতির অংশ। ধর্মীয় বিশ্বাসে গড়ে ওঠা এই প্রথা এখন বিলুপ্ত। কেনই বা তা বন্ধ হয়ে গেল জানুন।
Meta Description: দশমীতে নীলকণ্ঠ পাখি উড়ানোর ঐতিহ্য একসময় গভীরভাবে জড়িত ছিল দুর্গাপুজোয়। কেন এই প্রথা চালু হয়েছিল, আর কেন আজ আর দেখা যায় না জানুন।
দশমী ও নীলকণ্ঠ পাখির সম্পর্ক বাঙালির দুর্গাপুজোর ইতিহাসে এক বিশেষ অধ্যায়। পুজোর শেষ দিনে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর সময় নীলকণ্ঠ পাখি উড়ানোর রীতি ছিল বহু বনেদি বাড়ির ঐতিহ্য। এই পাখির বৈজ্ঞানিক নাম Coracias benghalensis, তবে বাংলায় এটি পরিচিত নীলকণ্ঠ নামে। শাস্ত্র, পুরাণ ও ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই আচার আজ আর নেই।
কেন উড়ানো হত নীলকণ্ঠ পাখি?
প্রাচীন বিশ্বাস অনুযায়ী, নীলকণ্ঠকে শিবের দূত বা প্রতিনিধি মনে করা হত। দুর্গাপুজোর দশমীর দিনে দেবী কৈলাসে ফেরার সময় এই পাখিকে উড়িয়ে দেওয়া মানে ছিল দেবীর আগমনের বার্তা শিবকে পৌঁছে দেওয়া। এটি দেবীকে বিদায়ের এক প্রতীকী রূপ। আবার রামায়ণ-এ উল্লেখ আছে, রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার আগে রামচন্দ্র নীলকণ্ঠ দেখেছিলেন, যা শুভ যাত্রা ও বিজয়ের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। তাই দুর্গোৎসবের দশমীতে এই পাখি উড়ানো হতো শুভলক্ষণে।
কেন বন্ধ হয়ে গেল এই প্রথা?
নব্বইয়ের দশক থেকে নীলকণ্ঠ পাখি উড়ানোর প্রথা ধীরে ধীরে বন্ধ হতে শুরু করে। এর প্রধান কারণ পাখির প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ। পুজোর আগে পাখি শিকারিরা তাদের ধরে খাঁচায় বন্দি করত, খাবার-পানি কম দেওয়া হত, আর অনেক সময় দুর্বল অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া হলে পাখিগুলো মারা যেত। প্রাণীর প্রতি এমন নিষ্ঠুরতা সমাজের চোখে ধরা পড়তে শুরু করে।
এছাড়াও, ভারতের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন, ১৯৭২ অনুযায়ী নীলকণ্ঠ সুরক্ষিত প্রজাতি। এই পাখি ধরা, বন্দি করা বা কেনাবেচা করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। পরিবেশপ্রেমী সংস্থা ও বন দফতরের উদ্যোগে এই প্রথা বন্ধে আন্দোলন জোরদার হয়।
পরিবেশবিদরা জানান, অবাধ শিকারের কারণে একসময় নীলকণ্ঠের সংখ্যা কমতে শুরু করেছিল। প্রজাতি রক্ষার স্বার্থে সরকারি ও সামাজিক উদ্যোগে এই অমানবিক রীতি বন্ধ করা হয়।
আজকের দিনে দশমী পালনের রূপ অনেক বদলেছে। এখন আর আকাশে উড়তে দেখা যায় না নীলকণ্ঠ। কিন্তু ইতিহাসে এই প্রথা বাঙালির সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ হয়ে রয়ে গেছে। পরিবেশ ও প্রাণী সুরক্ষার গুরুত্ব বুঝে মানুষ এই ঐতিহ্য থেকে সরে আসলেও, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আবেগ ও কৌতূহল এখনও মানুষের মনে জেগে ওঠে।



