নন্দীগ্রাম উপনির্বাচন ঘিরে তৃণমূল কংগ্রেসের (Trinamool Congress) অন্দরের সংঘাত এবার নতুন মাত্রা পেল। দলের বিদ্রোহী শিবির প্রকাশ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে (Mamata Banerjee) নন্দীগ্রাম থেকে প্রার্থী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। শুধু আহ্বান নয়, মমতা প্রার্থী হলে তাঁর বিরুদ্ধে নিজেদের কোনও প্রার্থী না দেওয়ার বার্তাও দিয়েছে তারা। ফলে ৬ অক্টোবরের উপনির্বাচনের আগে এই প্রস্তাবকে একইসঙ্গে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং কৌশল হিসেবে দেখছে রাজনৈতিক মহল।
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রে আগামী ৬ অক্টোবর উপনির্বাচন হওয়ার কথা। তার আগেই তৃণমূলের দুই শিবির নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনে ব্যস্ত। এর মধ্যেই দলের নাম ও জোড়াফুল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন কমিশনে চলা টানাপড়েনের প্রভাবও পড়ছে ভোটের প্রস্তুতিতে।
বিদ্রোহী তৃণমূলের মুখপাত্র ঋজু দত্তের বক্তব্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন্দীগ্রাম থেকে প্রার্থী হলে তাঁদের পক্ষ থেকে কোনও প্রার্থী দেওয়া হবে না। তাঁর কথায়, তাঁরা চান মমতা নন্দীগ্রাম থেকে লড়াই করে জয়ী হয়ে ফের বিধানসভায় ফিরুন।
নন্দীগ্রাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকেই বিজেপির প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) বিরুদ্ধে লড়েছিলেন তিনি। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর মমতা পরাজিত হন। সেই ফলাফল জাতীয় রাজনীতিতেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও নন্দীগ্রাম থেকে জয়ী হন শুভেন্দু। একই নির্বাচনে ভবানীপুরেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করেন তিনি। পরে ভবানীপুর আসনটি রেখে নন্দীগ্রাম ছেড়ে দেন শুভেন্দু। সেই কারণেই নন্দীগ্রামে উপনির্বাচনের প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
বিদ্রোহী শিবিরের বিধায়ক মদন মিত্রের বক্তব্য, বিরোধী ভোট যাতে ভাগ না হয়, সেই লক্ষ্যেই মমতাকে নন্দীগ্রাম থেকে লড়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তাঁর যুক্তি, তাঁদের শিবির যদি বিজেপির ‘বি-টিম’ হত, তাহলে বিরোধী ভোট ভাগ করার জন্য একাধিক প্রার্থী দাঁড় করানোই স্বাভাবিক ছিল।
মদনের দাবি, মমতা নন্দীগ্রাম থেকে লড়লে তাঁদের প্রার্থী না দেওয়ার সিদ্ধান্তই প্রমাণ করবে যে তাঁরা বিজেপিকে কোনও ভাবে বিরোধী ভোট ভাগ করার সুযোগ দিতে চান না। একইসঙ্গে ‘বিজেপির বি-টিম’ বলে তাঁদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠছে, সেটিও ভুল প্রমাণিত হবে বলে দাবি তাঁর।
নন্দীগ্রাম নিয়ে তৃণমূলের পুরনো ক্ষোভও এই আবহে ফের প্রকাশ্যে এসেছে। নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময়ের প্রবীণ তৃণমূল নেতা আবু তাহের প্রশ্ন তুলেছেন, মমতা এখন কেন নন্দীগ্রাম থেকে প্রার্থী হবেন না। তাঁর অভিযোগ, ২০২১ সালে মমতাকে নন্দীগ্রাম থেকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্তের আগে স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে যথেষ্ট আলোচনা করা হয়নি।
২০০৭ সালের জমি অধিগ্রহণ-বিরোধী আন্দোলনের জন্য জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে নন্দীগ্রাম। ওই আন্দোলন তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে তৃণমূলের সংগঠনকে শক্তিশালী করে এবং পরবর্তী সময়ে ২০১১ সালে রাজ্যে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসানের পথ প্রশস্ত করে।
পরবর্তী সময়ে সেই নন্দীগ্রামই বিজেপির রাজনৈতিক উত্থানের অন্যতম প্রতীকে পরিণত হয়। ২০২১ সালের মমতা-শুভেন্দু লড়াই কেন্দ্রটিকে জাতীয় রাজনীতির আলোচনায় নিয়ে আসে। এবার উপনির্বাচনের আগে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে ফের সেই কেন্দ্রের গুরুত্ব বেড়েছে।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংকটও প্রকাশ্যে আসে। বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৬৫ জন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Ritabrata Banerjee) নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীর পাশে দাঁড়িয়েছেন। বিরোধী দলনেতার পদ নিয়ে নিজেদের অবস্থান জানানোর পাশাপাশি বিদ্রোহীরা বিশেষ অধিবেশন ডেকে অরূপ রায়কে চেয়ারপার্সন নির্বাচিত করার কথাও জানিয়েছে।
দলের নাম ও জোড়াফুল প্রতীক নিয়েও নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত এখনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে। বিদ্রোহী শিবির জানিয়েছে, কমিশনের সিদ্ধান্ত তাদের পক্ষে না গেলে প্রয়োজন হলে নির্দল প্রার্থী হিসেবেও উপনির্বাচনে লড়াই করবে তারা। সেই প্রস্তুতিতে ইতিমধ্যেই বৈঠক শুরু হয়েছে বলে খবর।
এদিকে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচনের মনোনয়ন প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। ১৬ সেপ্টেম্বর মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন। ১৭ সেপ্টেম্বর হবে মনোনয়নপত্র পরীক্ষা। ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রার্থীপদ প্রত্যাহারের সুযোগ রয়েছে। ভোটগ্রহণ হবে ৬ অক্টোবর এবং ভোটগণনা ৯ অক্টোবর।
ফলে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিদ্রোহী শিবিরের এই আহ্বান নিছক ভোটের কৌশল নয়—তৃণমূলের দুই শিবিরের ক্ষমতার লড়াইয়ের নতুন পরীক্ষাও বটে। এখন দেখার, বিদ্রোহীদের এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে মমতা ফের নন্দীগ্রামে নামেন কি না। সেই সিদ্ধান্তের উপরই অনেকটাই নির্ভর করবে উপনির্বাচনের রাজনৈতিক উত্তাপ।



