হাইভোল্টেজ নন্দীগ্রাম উপনির্বাচন (Nandigram By Election) ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে। বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের ভরাডুবির পর এবার এই কেন্দ্রে কে প্রার্থী হবেন, তা নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। তৃণমূলের অন্দরে যখন প্রার্থী বাছাই নিয়ে টানাপোড়েন, তখন বিজেপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে উঠে আসছে একাধিক নাম। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) প্রয়াত আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথের মা হাসি রথ।
নন্দীগ্রামের বিধায়ক পদ ছেড়ে শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরই এই আসনে উপনির্বাচনের প্রয়োজন তৈরি হয়েছে। সেই আসনে বিজেপির হয়ে কাকে প্রার্থী করা হবে, তা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি দল। তবে ইতিমধ্যেই রেয়াপাড়ার বিধায়ক কার্যালয়ে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতৃত্বের উপস্থিতিতে একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ফলে প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে দলের ভিতরে আলোচনা যে শুরু হয়েছে, তা স্পষ্ট।
সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে হাসি রথের নাম সামনে আসার পিছনে রয়েছে আবেগ ও রাজনৈতিক দুই সমীকরণই। শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে তাঁর আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথ আততায়ীদের গুলিতে নিহত হন। চন্দ্রনাথের মা হাসি রথ দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ফলে তাঁকে প্রার্থী করা হলে ঘটনাটির সঙ্গে নন্দীগ্রামের রাজনৈতিক আবেগকেও যুক্ত করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ।
তবে শুধু হাসি রথের নামই নয়, সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আরও কয়েকজনের নাম ঘুরছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন অঞ্জন ভারতী, মেঘনাদ পাল এবং প্রলয় পাল। তিনজনই তমলুক সাংগঠনিক জেলা বিজেপির সঙ্গে যুক্ত এবং সংগঠনের কাজে তাঁদের সক্রিয়তা রয়েছে। ফলে শেষ পর্যন্ত দল কাকে বেছে নেয়, সেদিকেই নজর বিজেপির কর্মী-সমর্থকদের।
তমলুক সাংগঠনিক জেলা বিজেপির সভাপতি মলয় সিনহা অবশ্য প্রার্থী নিয়ে কোনও জল্পনায় যেতে চাননি। তাঁর বক্তব্য, দলের সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবেন রাজ্য ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। তাই এ বিষয়ে তিনি কোনও মন্তব্য করবেন না।
অন্যদিকে, উপনির্বাচনের প্রস্তুতিতে তৃণমূলের তৎপরতা এখনও চোখে পড়ছে না বলেই দাবি স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের। এমনকি প্রশাসনের ডাকা সর্বদলীয় বৈঠকেও তৃণমূলের প্রতিনিধিদের দেখা যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বিধানসভা ভোটের ফলের পর পূর্ব মেদিনীপুরে দলের সাংগঠনিক পরিস্থিতি নিয়েও একাধিক প্রশ্ন উঠেছে।
বিজেপি সরকার গঠনের পর থেকেই জেলার তৃণমূল নেতাদের অনেকেই দলীয় প্রতীক ও রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখছেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দলের পরিচিত মুখগুলির উপস্থিতিও আগের তুলনায় কমেছে। প্রাক্তন মন্ত্রী ও রামনগরের প্রাক্তন বিধায়ক অখিল গিরিকে অবশ্য দু-একবার দলীয় বৈঠকে দেখা গিয়েছিল বলে জানা যাচ্ছে।
কিন্তু উপনির্বাচন ঘোষণার পর অখিল গিরির সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না বলেও দাবি উঠেছে। তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ রয়েছে বলে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের একাংশের বক্তব্য। অন্য তৃণমূল নেতাদেরও ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ। যদিও দলের পক্ষ থেকে এই পরিস্থিতি নিয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এখনও সামনে আসেনি।
এর মধ্যেই তৃণমূলের ‘কালীঘাটপন্থী’ নেতা আবু তাহের দলের কঠিন সময়েও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নন্দীগ্রাম থেকে প্রার্থী হওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। ফলে একদিকে তৃণমূলের প্রার্থী নিয়ে অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে বিজেপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা—দুই মিলিয়ে নন্দীগ্রামের উপনির্বাচন ঘিরে জল্পনা তুঙ্গে।
শেষ পর্যন্ত হাসি রথ নাকি অন্য কোনও নাম—কাকে শুভেন্দু অধিকারীর ছেড়ে যাওয়া আসনে বিজেপি প্রার্থী করে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আর তৃণমূল এই উপনির্বাচনে কতটা সংগঠিতভাবে লড়াইয়ে নামে, তার উপরও নজর থাকবে রাজনৈতিক মহলের। নন্দীগ্রামের ফলাফল তাই শুধু একটি আসনের জয়-পরাজয় নয়, পূর্ব মেদিনীপুরে দুই দলের সাংগঠনিক শক্তিরও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হতে চলেছে।



