নবান্ন অভিযানের দিনে পুলিশের বিরুদ্ধে মারধরের গুরুতর অভিযোগ তুলেছে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের নির্যাতিতার পরিবার। তাঁদের দাবি, পার্কস্ট্রিটের কাছে মিছিল আটকে দিয়ে পুলিশ লাঠিচার্জ চালায়। এতে নির্যাতিতার মা ও বাবা—দুজনেই মারাত্মক আহত হন। পরে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁদের দ্রুত কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ঘটনা শুরু হয় যখন মেয়ের ধর্ষণ ও খুনের বিচার চেয়ে নির্যাতিতার মা-বাবা নবান্ন অভিযানে অংশ নেন। পার্কস্ট্রিটের কাছে তাঁদের মিছিল আটকে দেয় পুলিশ। পরিবারের অভিযোগ, তখনই তাঁদের রাস্তায় ফেলে ভোঁতা জিনিস দিয়ে আঘাত করা হয়। মায়ের মাথায় মারাত্মক চোট লাগে, বাবার শরীরেও চিহ্ন দেখা যায়।


রেসকোর্সের কাছে অবস্থান চলাকালীন নির্যাতিতার মা হঠাৎ মাথা ঘোরানো ও শ্বাসকষ্টে ভুগতে শুরু করেন। সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত মানুষরা চোখেমুখে জল দেন, কিন্তু অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাঁকে এবং তাঁর স্বামীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রাথমিক চিকিৎসার পর মাথার চোটের মাত্রা বোঝার জন্য সিটি স্ক্যান করা হয়েছে, এমআরআইও করা হবে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, কপালে স্পষ্ট ফোলা রয়েছে এবং পিঠে একাধিক কালশিটে দাগ। তাঁদের মতে, এগুলি ভোঁতা কিছু দিয়ে জোরে আঘাতের ফলেই হয়ে থাকতে পারে।
হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায় নির্যাতিতার মা সাংবাদিকদের বলেন, “আজ আমায় রাস্তায় ফেলে অনেক পুলিশ মেরেছে। কেন আমায় মারা হল? কেন আমার মেয়ের ক্ষেত্রে পুলিশ তৎপর হয়নি?” তাঁর কণ্ঠে ছিল ক্ষোভ ও কান্না মেশানো যন্ত্রণা।
অন্যদিকে পুলিশের দাবি, নির্যাতিতার মা-বাবাকে মারধর করা হয়নি। তাঁরা জানিয়েছেন, ভিড় সামলাতে ধস্তাধস্তি হলেও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ সত্য নয়। তবে পরিবারের অভিযোগ এবং চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে।


পরিবারের পাশে দাঁড়াতে হাসপাতালে যান পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তিনি দাবি করেন, “মাকে হাসপাতালে ভর্তি করা মানেই চোট গুরুতর। তিনি জ্ঞান আছে, কিন্তু কান্না থামছে না। সম্ভবত মেয়ের জন্য বিচার চাইতে এসে মার খাওয়ার আঘাতেই এই অবস্থা।” শুভেন্দুর কথায়, চিকিৎসকেরা তাঁকে বাড়তি নজরে রাখছেন এবং ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই ঘটনার পর রাজনৈতিক মহলেও তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। শাসক ও বিরোধী শিবির একে অপরকে দোষারোপ করছে। বিরোধীদের দাবি, সাধারণ নাগরিকদের উপর পুলিশের এই ধরণের আচরণ গণতন্ত্রের জন্য হুমকি। অন্যদিকে, শাসক শিবির বলছে, বিরোধীরা ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাচ্ছে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—নির্যাতিতার মা-বাবার শারীরিক অবস্থা কতটা দ্রুত উন্নতি হবে এবং তাঁদের অভিযোগের ভিত্তিতে কোনও তদন্ত হবে কি না। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, সিটি স্ক্যান রিপোর্টে মাথায় আঘাতের প্রমাণ মিললে চিকিৎসা আরও সময়সাপেক্ষ হবে।
ঘটনার পর থেকে হাসপাতাল চত্বরে মিডিয়া ও সমর্থকদের ভিড় লেগেই রয়েছে। নির্যাতিতার মায়ের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতে প্রতিনিয়ত খবর নিচ্ছেন অনেকেই। তবে তাঁর ফোলা কপাল, কালশিটে পিঠ আর চোখের জল—সবই যেন নবান্ন অভিযানের দিনটির নৃশংসতার নীরব সাক্ষী হয়ে আছে।








