ভারতকে ‘বিশ্বগুরু’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক ও আদর্শগত পরিসরে আলোচনা চলছে। এমন এক সময়ে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের সাম্প্রতিক মন্তব্য নতুন করে বিতর্ক ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছে। তাঁর বক্তব্য, ভারতের সামনে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ এলেও পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাবে সেই লক্ষ্যে এখনও পৌঁছনো সম্ভব হয়নি।
নাগপুরে সংঘের এক প্রশিক্ষণ শিবিরে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মোহন ভাগবত বলেন, বর্তমান বিশ্ব নানা সংকট ও সংঘাতে জর্জরিত। এমন পরিস্থিতিতে ভারত মানবসভ্যতাকে নতুন দিশা দেখানোর ক্ষমতা রাখে। তবে সেই দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার জন্য যে প্রস্তুতি ও সক্ষমতা প্রয়োজন, তা এখনও সম্পূর্ণভাবে অর্জিত হয়নি বলে তাঁর অভিমত।
সংঘপ্রধানের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে ‘শক্তি’ এবং ‘প্রস্তুতি’র প্রসঙ্গ। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক পরিসরে কোনও দেশের নৈতিক অবস্থান বা সত্যের পক্ষে থাকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, সেই দেশের বাস্তব শক্তি ও সক্ষমতাও সমান জরুরি। বিশ্ব সাধারণত সেই রাষ্ট্রকেই গুরুত্ব দেয়, যার প্রভাব ও শক্তি বেশি।
ভাগবত স্পষ্ট করেছেন, ভারতকে বিশ্বগুরু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন আরএসএস দীর্ঘদিন ধরে লালন করে আসছে। কিন্তু শুধুমাত্র আদর্শ বা ঐতিহ্যের উপর নির্ভর করে সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংগঠনিক এবং কৌশলগত শক্তি আরও বৃদ্ধি করতে হবে বলেই তাঁর মত।
এই মন্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়েই এখন আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ গত কয়েক বছরে বিজেপির একাংশের নেতা ও সমর্থকরা আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিশ্বজোড়া গ্রহণযোগ্যতাকে ‘বিশ্বগুরু ভারতের উত্থান’ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
সেই প্রেক্ষাপটে মোহন ভাগবতের বক্তব্যকে অনেকেই আত্মসমালোচনার বার্তা হিসেবে দেখছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, সংঘপ্রধান হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন যে আন্তর্জাতিক সম্মান বৃদ্ধি পেলেও প্রকৃত অর্থে বিশ্বনেতৃত্বের জায়গায় পৌঁছতে গেলে আরও দীর্ঘ পথ পেরোতে হবে।
তবে আরএসএসের পক্ষ থেকে কোথাও বিজেপি বা কেন্দ্রীয় সরকারের সরাসরি সমালোচনা করা হয়নি। বরং বক্তব্যের মূল সুর ছিল ভবিষ্যতের লক্ষ্য নির্ধারণ এবং সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির উপর জোর দেওয়া।
ফলে প্রশ্ন উঠলেও, এই মন্তব্যকে সরাসরি সংঘ-বিজেপি মতবিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। বরং এটি ভারতকে আরও শক্তিশালী, আত্মনির্ভর এবং প্রভাবশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান বলেই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।
সব মিলিয়ে, মোহন ভাগবতের বক্তব্য নতুন করে ‘বিশ্বগুরু ভারত’ ধারণাকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে এনে দিয়েছে। ভারতের আন্তর্জাতিক অবস্থান নিয়ে গর্বের পাশাপাশি ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ ও প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তাও যে সমান গুরুত্বপূর্ণ, সংঘপ্রধানের মন্তব্যে সেই বার্তাই স্পষ্ট হয়েছে।



