জহরলাল নেহেরুর পর তিনি। অষ্টাদশ সাধারণ নির্বাচন জিতে তৃতীয় বারের জন্য ভারতের রাশ আবার হাতে নিতে চলেছেন নরেন্দ্র মোদী। যদিও এবার তাঁর সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতায় এসেছে জোটের সহায়তায়। ফলে, একমাত্র দল হিসাবে বিজেপি ক্ষমতায় নেই। বারাণসী কেন্দ্র থেকেই পদ্ম-ভোটে জিতেছেন মোদী। সেখানেও ব্যবধান কমেছে। এনডিএ জোট সরকার ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকলেও পার্লামেন্টে বিরোধিরা যথেষ্ট সংখ্যায় থাকছেন। এদিকে আর ২৪ ঘন্টার অপেক্ষা। রবিবার সন্ধ্যে ৭টা নাগাদ প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিতে চলেছেন নরেন্দ্র মোদী।
আরও পড়ুন: জনগর্জন নামকরণ থেকে বুথ ভিত্তিক স্ট্র্যাটেজি, অভিষেকের নেতৃত্বেই ব্যাপক সাফল্য, মানছেন সবাই


এবারের লোকসভা ফলাফল একটা জিনিস স্পষ্ট করে দিয়েছে, শুধু মাত্র হিন্দুত্ব গণতন্ত্রের একমাত্র অবলম্বন হতে পারে না। বাংলা তথা দেশের একাধিক বিজেপি নেতাকে এ কথা প্রকাশ্যে বলতে দেখা গেছে, আমরা কেবল হিন্দুদের ভোটটাই পাই। শুভেন্দু অধিকারী প্রচারে বলেছেন ‘হিন্দু মানেই বিজেপি’, কিংবা, গণনার দিন সুকান্ত মজুমদার বলেছেন ‘হিন্দু ভোটে জিতেছি, মুসলমান ভোট আমরা পাইনা, পাবও না’। ভাবটা কিছুটা এরকম, মুসলিম বা অন্যান্য সম্প্রদায়ের ভোটটা পেয়ে ক্ষমতায় এলেও আমরা সচেতনভাবেই ‘লঘু’-দের গুরুত্ব দেবনা! আর এই হিন্দুত্বের বাইরে বিজেপিকে ভরসা করতে হয়না, সেটাও সংখ্যার বিচারেই। কারণ, দেশে প্রায় ৭৮ শতাংশ হিন্দু। ভোট দেন মেরেকেটে তা-ও প্রায় ৭০ শতাংশ। আর ম্যাজিক ফিগারটা হল ২৭২, সেটা ৫০ শতাংশ। ফলে, হিন্দুদের পূর্ণ সমর্থন না পেলেও ক্ষমতায় আসা তাদের আটকায় না, এটা তারা বোঝেন।

আর এবার যেটা বুঝলেন, হিন্দুদেরই সম্পূর্ণ ভোটই যদি বিজেপি পেয়ে থাকে, তাহলেও মাত্র ৩৬ শতাংশ সনাতনী তাদের সমর্থন করছেন, অর্থাৎ মোট হিন্দু ভোটারদের অর্ধেকের সামান্য বেশি। সেই ‘সামান্য’ নিয়েই হয়তো পাশ করে গেলেন নরেন্দ্র মোদী। বাকি হিসেব তো আরই জটিল এবং বিজেপির জন্য অত্যন্ত খুব একটা সুখকর নয়। কারণ, শুধু মাত্র হিন্দুরা বিজেপিকে ভোট দেননা, ভোট সংমিশ্রণ হয়ে থাকে। অতএব, যে হিন্দুত্বের ধ্বজা উড়িয়ে ভোট-ভিক্ষা করতে চাইছে বিজেপি, তার কিয়দাংশও যে আর সমর্থনে নেই তা স্পষ্ট। তবে হ্যাঁ, একটা পরিসংখ্যান বিরোধীরা খুব প্রকাশ্যে আনছেন না তা হল, মাত্র ৬ লাখ কম ভোট থাকার কারণে ২৭২ আসন জিততে পারেনি বিজেপি। ফলে, বিরোধীরা যদি এই সাফল্যের জোয়ারে গা ভাসিয়ে দেন, তাহলে ভুল হবে বৈকি।



এবার আসা যাক, নরেন্দ্র মোদীর কথায়। বিগত ১০ বছরের ভারতের প্রধানমন্ত্রী। ভোটে প্রচার করেছেন কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী। তার নিজের নামেই ছিল নিজের প্রচার। ‘ইসবার ৪০০ পার’ এর সঙ্গেই উচ্চারিত হত ‘ফির একবার মোদী সরকার’। অযোধ্যার রাম মন্দির লোকসভার আগে গো বলয়ে একটা বড় প্যাকেজ। তার আগে চন্দ্রযান, জি-২০ সামিট। ধাপে ধাপে নির্বাচনের পরিকল্পনা ছিলই মোদীর। প্রস্তুতিও ছিল জমাটি। কারণ, তাদের ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াই। শেষ দু’মাসব্যাপী বিজ্ঞাপনে ঝড় তুলে চোখ কাড়ার চেষ্টা। কিন্তু, এবার কি সত্যিই নরেন্দ্র মোদী জিতেছেন? তাঁর হাসি, তাঁর চোখ কি সেই কথা বলছে? অমিত শাহ আর রাজনাথ সিংহ কে দূরে ঠেলে দিতে হচ্ছে, পাশে রাখতে হচ্ছে নীতীশ কুমার বা চন্দ্রবাবু নায়ডুকে। তাদের গতিপরিবর্তনের ইতিহাস কি ভাবাচ্ছে না মোদীকে?
খামতি প্রকট সঙ্গে এক দশকের অভিজ্ঞতা, ২৪ ঘন্টা পরেই আবার ভারতের রাশ মোদীর হাতে

দুর্বলতা টের পাচ্ছেন কিংবা পেয়েছেন। সমীকরণে বদল আনতে হবে। ১০ বছরে মানুষ দেখেছে, এখন আর সেই নতুনত্ব নেই। হিন্দুত্বের মধ্যেই যে বহুত্ববাদের ইতিহাস সেখানে সব কিছুকে ‘এক’-এ রূপান্তরিত করার প্রচেষ্টায় তীব্র ব্যর্থতা এল। স্বয়ং আর্যভট্ট যেখানে এই দেশে বসে শূন্যের আবিষ্কার করেছেন! একদিকে, যথেষ্ট দাবিদাওয়া সম্পন্ন শরিক দল, অন্যদিকে, ভরপুর বিরোধী শক্তি। দেশের উন্নয়নমূলক কাজে একটা বাধা সৃষ্টি হতে পারে বলে দাবি করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিজেপির এই হতশ্রী ফলাফল বেশিরভাগটাই ব্যক্তিগত মোদীর ‘হার’ বলে চিহ্নিত হচ্ছে। প্রশ্ন ছিলই, মোদীর বাইরে বিজেপি-র বিকল্প কোথায়? আসলে, ভোটটা পদ্মের কমেছে, সম্পূর্ণ প্রাপ্ত ভোটোটাই মোদী-ক্যারিশ্মা। ফলে, মোদী নির্ভরতা থেকে না বেরোলে বিজেপির অগ্রগতি মুশকিল।
অনেকে আবার কনাঘুষো একটা সাংঘাতিক কথা বলছেন, এবার স্বচ্ছ ভোট করানোর পরিকল্পনা ছিল বিজেপি সরকারের। নিজের অমেদ ওজন মাপতে চাইছিল পদ্ম গোষ্ঠী। একেবারে কাঁটায় কাঁটায় পক্ষ যাচাই করতে গিয়ে এই বিপত্তি। অবস্থাটা এরকম, দু’দিকেই জোট। আপাতত ক্ষমতায় আসছে এনডিএ। ‘ইন্ডিয়া’ জোটের কাছে ‘দিল্লি বহুত দূর’। তারা ক্ষমতায় এলে আরও অনেক প্রশ্ন। ৯ তারিখ রাতেই ভারত-পাকিস্তান খেলা, বিশ্বকাপে, সেদিনই নরেন্দ্র মোদীর শপথ। ক্রিকেটেও ভারত টুর্নামেন্টের একেবারে সূচনালগ্নে। এনডিএ সরকারও তাই। নতুন পর্বে নরেন্দ্র মোদীর পারফরম্যান্সের দিকে মুখিয়ে দেশবাসী।







